প্রারম্ভিকা :
এই বিশাল মহাবিশ্বের পরতে পরতে মিশে আছে মহান আল্লাহ তা‘আলার নিপুণ কারুকার্য। তিনি কেবল আমাদের সৃষ্টিই করেননি, বরং আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং জীবনকে সুন্দর করতে সৃষ্টি করেছেন আসমান-যমীন, আগুন-পানি, মাটি আর বাতাসের মতো অপরিহার্য উপাদানসহ অগণিত মাখলুক। আমরা জগতের যা কিছু দেখি, তার প্রতিটি অণু-পরমাণু সেই পরম সত্তারই দান।
বর্তমানে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের যেসব বিস্ময়কর আবিষ্কার বা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ দেখে বিমোহিত হই, গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়—এগুলো মূলত মহান আল্লাহরই সৃষ্টির বর্ধিত রূপ। মানুষের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রকৃতিতে বিদ্যমান কাঁচামাল—সবই তাঁর সৃষ্টি। স্রষ্টা ছাড়া কোনো সৃষ্টি যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তাঁর দেওয়া উপাদানের বাইরে নতুন কিছু উদ্ভাবন করাও মানুষের সাধ্যাতীত। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُمْ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيْعًا
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের (কল্যাণের) জন্য সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:২৯)
সময় বা কাল কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; আল্লাহ নিজেই কালের স্রষ্টা। যুগে যুগে মানুষ যে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন করছে, তা মূলত আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক নিয়ম ও পদার্থের গুণাগুণকে কাজে লাগিয়েই করা হচ্ছে। আগুনের দহন ক্ষমতা, বাতাসের গতিবেগ কিংবা মাটির উর্বরতা—এসবই পরম করুণাময় আমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন বলেই আজ আমরা উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারছি।
যুগের চাহিদা পূরণে আমাদের সামনে হয়ত আরো কত অজানা আবিষ্কার অপেক্ষা করছে। নির্দিষ্ট সময়েই কেবল তা আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়।যেমন ঘোষণা হয়েছে
وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا عِندَنَا خَزَائِنُهُ وَمَا نُنَزِّلُهُ إِلَّا بِقَدَرٍ مَّعْلُوم﴾
আমার কাছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার রয়েছে। আমি নির্দিষ্ট পরিমানেই তা অবতরণ করি। (সূরা হিজর: ১৫:২১)
আধুনিক প্রযুক্তি: স্রষ্টার নেয়ামত ও আমাদের দায়বদ্ধতা
বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের জয়যাত্রার যুগ। প্রযুক্তির অভাবনীয় কল্যাণে আজ বিশাল এই পৃথিবী পরিণত হয়েছে একটি ছোট ‘বিশ্বগ্রামে’ (Global Village) । মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যাচ্ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে; হাজার মাইলের দূরত্বকে তুচ্ছ করে মানুষ একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে অনায়াসেই। কেননা, পৃথিবীর এই রুদ্ধশ্বাস উন্নয়ন আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতা মূলত ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে আল্লাহরই এক বিশেষ অনুকম্পা।
এই মতের শুকরিয়া বের করা মুমিনের জন্য উত্তরাধিকার। জ্ঞানতাই কেবলমাত্র কৃতকার্য দেয়।
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
“যদি তোমরা তোমরা প্রকাশ কর, আমি অবশ্যই তোমাদের আরও ফল। (সূরা ইবরাহীম, ১৪:০৭)
আর শুকরিয়ার সর্বনিম্ন উচ্চারণ—আল্লাহর দেওয়া মতবাদকে সঠিক পথ বলেও সমর্থন করা এবং কোনো তা নাফরমা বা পাপের পথ আগা না করা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ইসলামের শাশ্বত দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামের মূল দর্শনে বিজ্ঞানের উপস্থিতি স্বীকার্য। মানুষের জন্মরহস্য ও জীবনচক্র নিয়ে মহান আল্লাহর আদর্শে যে শৈল্পিক বৈজ্ঞানিক বর্ণনা, তা চিন্তাশীলদের জন্য পরম বিস্ময়। ইরশাদ হয়েছে:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ مِنْ نُطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخًا ۚ وَمِنْكُمْ مَنْ يُتَوَفَّىٰ مِنْ قَبْلُ ۖ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلًا مُسَلَعًا وَجَلًا مُسَلَعًا تَعْقِلُونَ
“আমাদের মধ্যে মাটি থেকে, তারপর শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর জমাট রক্ত থেকে। অতঃপর তাকে বের করে আনে শিশু, তারপরে তোমরা যাতে তোমরা সম্পূর্ণ শক্তিতে আত্মস্থ কর, তারপরে তাদের মধ্যে কেউ মারা যাও এবং অন্য কেউ তাদের বুঝতে চেষ্টা কর।
এই আয়াতের পর্যায় ভ্রুণতত্ত্ব ও জীববিজ্ঞানের এক প্রামাণ্য সত্য। একফোঁটা তুচ্ছ তরল থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের বিবর্তন এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই পথের পথের উত্তর দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে— ‘যাতে তোমরা অনুধাবন কর’। ভিন্ন, ভিন্নজগতকে বিচার- জ্ঞান দিয়ে অনুধাবন করা মানুষের এক আবশ্যিক দায়বদ্ধতা।
কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনাকে পাথেয় করেই মধ্যযুগে মুসলিম বিজ্ঞানীগণ বিশ্বসভ্যতায় সোনালী বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তৎকালীন ইউরোপ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত, মুসলিম শাসিত স্পেন তখন ছিল আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র। রসায়ন, চিকিৎসা, পদার্থবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের মতো আধুনিক শাস্ত্রগুলোর ভিত্তি গড়েছিলেন মুসলিমরাই।
রসায়ন শাস্ত্র: জাবির বিন হাইয়ানকে বলা হয় আধুনিক রসায়নের জনক।
চিকিৎসা বিজ্ঞান: আল-রাযী ও ইবনে সীনার চিকিৎসা পদ্ধতি আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
পদার্থ ও সমাজবিজ্ঞান: ফলিত পদার্থবিদ্যায় আল-ফারগানী এবং সমাজতত্ত্বের ধারক হিসেবে ইবনে খালদুন বিশ্বনন্দিত নাম।
ইসলামে ‘আকল’ (বিচার-বুদ্ধি) ও ‘ফিকর’ (গভীর চিন্তা)-কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ৪৯ বার ‘আকল’ এবং ১৮ বার ‘ফিকর’ শব্দের উল্লেখ প্রমাণ করে যে, অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং যুক্তি ও গবেষণা মুমিনের ভূষণ। আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন:
أَوَلَمْ يَتَفَكَّرُوا فِي أَنْفُسِهِمْ ۗ مَا خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَأَجَلٍ مُسَمًّى ۗ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ بِلِقَاءِ رَبِّهِمْ لَكَافِرُونَ
“তারা কি নিজেদের মধ্যে চিন্তা করে না? আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং এদের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। কিন্তু মানুষের অনেকেই তাদের রবের সাক্ষাতে অবিশ্বাসী।”সূরা রূম (৩০:৮)
তবে প্রতিটি জিনিসেরই ভালো-খারাপ দিক রয়েছে। মানুষ চাইলে তাকে যে কোন পথে ব্যবহার করতে পারে। প্রযুক্তিও তার ব্যতিক্রম নয়। এটিকে যেমন ইসলামের খেদমতে ব্যবহার করা সম্ভব। তেমনি খারাপ পথেও তা ব্যবহার করা যায়। লক্ষণীয় যে, আমরা প্রযুক্তিকে কোন কাজে ব্যবহার করছি সেটাই বিবেচ্য বিষয়। আমরা যদি প্রযুক্তিকে ইসলাম প্রচারের কাজে লাগাই তাহ’লে সব ধরনের প্রযুক্তিই কল্যাণের মাধ্যম হবে।
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা মানুষের জীবনকে করেছে গতিময় ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ। ইসলামের সাথে বিজ্ঞানের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই; বরং বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল হলেও ইসলাম চিরন্তন সত্যের ধারক। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদ আজ অপব্যবহারের আবর্তে পড়ে মানবজাতির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেয়ামতগুলো আজ পরিণত হচ্ছে পাপাচারের উপাদানে। নিচে এর কয়েকটি ভয়াবহ দিক তুলে ধরা হলো:
১. মোবাইল ও স্মার্টফোনের মোহজাল
যোগাযোগের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়া মোবাইল ফোন আজ অপসংস্কৃতি ও চারিত্রিক স্খলনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। যে ‘স্মার্টফোন’ ব্যক্তিকে আরও জ্ঞানদীপ্ত ও দক্ষ করতে পারত, তা আজ ব্যবহৃত হচ্ছে ব্ল্যাকমেইলিং, নগ্নতা প্রদর্শন এবং অশ্লীলতার প্রসারে। বিভিন্ন সিম কোম্পানির চটকদার অফার তরুণ প্রজন্মকে এক অন্তহীন অনর্থক নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা ভুলে যাচ্ছে যে, প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব রাখা হচ্ছে। মহান আল্লাহ সতর্ক করেছেন:
কথা ও কাজের হিসাব হবে এবং এসবের রেকর্ড থাকবে। আল্লাহ বলেন,مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ-
“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (সূরা ক্বাফ: ১৮)
২. সোশ্যাল মিডিয়া ও নৈতিক অবক্ষয়
ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখন পারস্পরিক সৌহার্দ্যের চেয়ে পরকীয়া, নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশা এবং প্রদর্শনবাদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অর্ধনগ্ন ছবি ও ভিডিওর প্লাবন আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর মূলে কুঠারাঘাত করছে। অশ্লীলতার এই প্রচার সম্পর্কে আল্লাহর হুঁশিয়ারি অত্যন্ত কঠোর:
যা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরানিবত করছে। অথচ অশ্লীলতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّ الَّذِيْنَ يُحِبُّوْنَ أَنْ تَشِيْعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيْمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ- ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, নিশ্চয়ই তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নূর ২৪/১৯)।
৩. ইন্টারনেটের মরণনেশা ও কিশোর অপরাধ
ইন্টারনেট পুরো বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনলেও এর অপব্যবহারের চড়া মাশুল দিচ্ছে আগামী প্রজন্ম। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা কিশোরদের মন-মগজকে বিষাক্ত করে তুলছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমাজে ইভটিজিং, ধর্ষণ, হত্যা ও গুমের মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এক মোবাইল থেকে অন্য মোবাইলে ওয়াইফাই বা ব্লুটুথের মাধ্যমে অতি সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে ঈমান বিধ্বংসী সব কন্টেন্ট। অভিভাবকীয় নজরদারির অভাবেই এই ক্ষত আজ ক্যান্সারের রূপ নিয়েছে।
৪. আকাশ সংস্কৃতির বিষবাষ্প ও টেলিভিশন
এক সময়ের বিনোদনের মাধ্যম টেলিভিশন আজ অনেকের কাছেই ‘শয়তানের বাক্সে’ রূপ নিয়েছে। ভিনদেশি সিরিয়ালের প্রতি অন্ধ আসক্তি আমাদের মা-বোনদের মাঝে বিজাতীয় পোশাক, ভাষা ও সংস্কৃতিকে গেঁথে দিচ্ছে। সুস্থ ধারার ইসলামিক বিনোদন বা চ্যানেলের অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডা. যাকির নায়েকের ‘পিস টিভি’র মতো বৈপ্লবিক প্রচেষ্টাগুলোও আজ নানামুখী ষড়যন্ত্রের শিকার। ফলে মুসলিম পরিবারগুলো নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে এক কৃত্রিম ও অপসংস্কৃতির জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে।
৫. প্রিন্ট মিডিয়া ও প্রচার মাধ্যমের নির্লিপ্ততা
পত্রিকা, ম্যাগাজিন কিংবা রাস্তার ধারের বিশালাকার বিলবোর্ড—সবখানেই আজ সুন্দরের চেয়ে অশ্লীলতার জয়গান বেশি। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই অর্ধনগ্ন ছবির আধিক্য পাঠককে বিব্রত করে। ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচারের জন্য যেখানে বিশাল কলাম বরাদ্দ থাকার কথা, সেখানে তা আজ অবহেলিত ও কোণঠাসা।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব: নববী আদর্শ ও আধুনিক বাস্তবতা
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির সরব উপস্থিতি। বিজ্ঞানের এই অনবদ্য অবদানকে অস্বীকার করার যেমন উপায় নেই, তেমনি এর অপব্যবহারের ভয়ে একে চিরতরে বর্জন করাও সম্ভব নয়। বরং সময়ের দাবি হলো—প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করে এর সঠিক ও কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। বস্তুত, প্রযুক্তির যথার্থ প্রয়োগই পারে একটি আদর্শ ও জ্ঞানদীপ্ত সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে।
১. দাওয়াতের ময়দানে প্রযুক্তির নববী কৌশল
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেক নবী ও রাসূল তাঁদের সমসাময়িক যুগের সর্বোত্তম মাধ্যম ও কৌশল (তৎকালীন প্রযুক্তি) ব্যবহার করে মহান আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত প্রচার করেছেন। তাঁরা উম্মতকে শিখিয়েছেন কীভাবে সময়ের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হয়।
মূসা (আলাইহিস সালাম): তাঁর যুগে জাদুর প্রভাব ছিল প্রবল। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত মুজেযা (লাঠি ও উজ্জ্বল হাত) ব্যবহার করে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ জাদুকরদের পরাজিত করেছিলেন এবং ফেরাউনের সম্প্রদায়ের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিলেন। ফলে সত্যের দাপটে অসংখ্য জাদুকর মস্তক অবনত করে ঈমান এনেছিল।
ঈসা (আলাইহিস সালাম): তাঁর সময়ে চিকিৎসাবিদ্যার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তিনি আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধকে দৃষ্টিদান এবং মৃতকে জীবিত করার মতো অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে সমকালীন চিকিৎসকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিলেন এবং মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিলেন। (সূরা মায়েদাহ: ১১০)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম): বিশ্বনবী (সা.) আরবের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ সম্পদ ‘উচ্চাঙ্গের সাহিত্য’ ব্যবহার করে ইসলামের সুমহান বাণী প্রচার করেছেন। তিনি ছাফা পাহাড়ের উঁচুতে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রচার কৌশল অবলম্বন করে সমবেত মানুষকে সত্যের পথে ডেকেছেন। উন্নত রণকৌশল ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে তিনি ইসলামকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
২. জাতীয় উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার সোপান
একটি দেশ বা জাতিকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং এর সঠিক প্রয়োগ। যে জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞানে যত বেশি পারদর্শী, বিশ্বমঞ্চে তারা তত বেশি প্রভাবশালী। ইসলাম জ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চাকে কেবল উৎসাহিতই করেনি, বরং একে ইবাদতের অংশ হিসেবে গণ্য করেছে।
প্রয়োজনে জ্ঞানার্জনের জন্য বিদেশ থেকে প্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য থাকতে হবে ‘স্বনির্ভরতা’র ওপর। অন্যের ওপর চিরকাল নির্ভরশীল হয়ে থাকা কোনো মর্যাদাবান জাতির লক্ষণ নয়। বিশ্বায়নের এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়া এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
৩.আমাদের করণীয়
প্রযুক্তি কোনো প্রাণহীন যন্ত্র মাত্র নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একে আমরা যদি গঠনমূলক কাজে, ইসলামের দাওয়াত প্রসারে এবং মানবসেবায় নিয়োজিত করি, তবে তা হবে আমাদের জন্য পরকালীন মুক্তির অসীলা। প্রযুক্তির অন্ধকার পথ পরিহার করে আলোর পথে চলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও আদর্শিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
আধুনিক প্রযুক্তির আঙিনায় ইসলামের দাওয়াত: কৌশল ও করণীয়
বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগে দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হলো আধুনিক প্রযুক্তি। স্বল্প শ্রমে ও অল্প সময়ে অগণিত মানুষের হৃদয়ে ইসলামের শাশ্বত বাণী পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে, এই ময়দানে ছহীহ আক্বীদার ধারক-বাহকদের অনুপস্থিতির সুযোগে বিভিন্ন ভ্রান্ত গোষ্ঠী তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করছে। তাই প্রযুক্তির প্রতিটি মাধ্যমকে ইসলামের সেবায় নিয়োজিত করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। নিচে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করা হলো:
১. টেলিভিশন ও রেডিও মিডিয়া
পরিবারের প্রধান বিনোদন মাধ্যম টেলিভিশনকে ‘শয়তানের বাক্স’ থেকে মুক্ত করে ‘হেদায়েতের আলো’য় রূপান্তর করতে হবে। ইসলামী নেতৃবৃন্দের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মূলধারার চ্যানেলগুলোতে মানসম্পন্ন ইসলামী অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যদিকে, বর্তমানে মোবাইল ফোনের কল্যাণে রেডিওর পরিধি বেড়েছে। স্বল্প ব্যয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য ‘কমিউনিটি রেডিও’ একটি দুর্দান্ত মাধ্যম হতে পারে।
২. প্রিন্ট মিডিয়া ও প্রকাশনা
সমাজের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনে প্রিন্ট মিডিয়ার ভূমিকা চিরস্থায়ী। বর্তমানে এই মাধ্যমটি সেক্যুলার ও বামপন্থী মতাদর্শের দখলে থাকায় মুসলিম শিশুদের মন-মগজে বিজাতীয় চিন্তাধারা প্রবেশ করছে। এই সংকট উত্তরণে বিত্তবান ও মেধাবীদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের ইসলামমুখী করতে আকর্ষণীয় ও রুচিশীল ‘শিশুতোষ পত্রিকা’ প্রকাশ করে তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে।
৩. কম্পিউটার ও সফটওয়্যার প্রযুক্তি
আধুনিক বিশ্বের চালিকাশক্তি কম্পিউটারকে ইসলামী গবেষণার প্রধান সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ডিজিটাল লাইব্রেরি: কুরআন-হাদীছ ও রেফারেন্স গ্রন্থের জন্য ‘মাকতাবা শামেলা’র মতো সফটওয়্যারের ব্যবহার প্রতিটি গবেষকের জানা আবশ্যক।
অনুসন্ধান সহজীকরণ: বিভিন্ন অ্যাপ ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শব্দ বা বিষয় দিয়ে মুহূর্তেই আয়াত ও হাদীছ খুঁজে বের করা এখন অনেক সহজ। এই ডিজিটাল ভাণ্ডারগুলোকে আরও সমৃদ্ধ ও জননন্দিত করতে হবে।
৪. ওয়েব ও অনলাইন মিডিয়া
ইন্টারনেট জগতে মুসলিমদের অবস্থান সংখ্যাগত ও গুণগত দিক থেকে এখনও বেশ দুর্বল। অশ্লীলতার সয়লাব মোকাবিলায় বাংলা ভাষায় উচ্চমানের ইসলামী ওয়েবসাইট, ব্লগ এবং নিউজ পোর্টাল তৈরি করা জরুরি।
উইকিপিডিয়া: পৃথিবীর বৃহত্তম এই মুক্ত বিশ্বকোষে ইসলামী নিবন্ধগুলো খুবই অবহেলিত। তরুণ প্রজন্মের উচিত তথ্য ও রেফারেন্স দিয়ে উইকিপিডিয়াকে সমৃদ্ধ করা।
ব্যাকআপ ও বৈচিত্র্য: অনৈসলামী শক্তির অপতৎপরতা থেকে বাঁচতে সাইটগুলোর নিয়মিত ব্যাকআপ রাখা এবং অডিও-ভিডিও ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দাওয়াতে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন।
৫. ই-মেইল ও সোশ্যাল মিডিয়া
ই-মেইল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ও গ্রুপ মেসেজের মাধ্যমে গঠনমূলক দাওয়াত দেওয়া সম্ভব। এছাড়া ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম ও লিঙ্কডইন-এর মতো মাধ্যমগুলো বর্তমানে সব বয়সী মানুষের বিচরণক্ষেত্র।
পদ্ধতি: দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিরোধিতামূলক বা খন্ডনমূলক প্রচারের চেয়ে ইতিবাচক ও তথ্যনির্ভর আলোচনা অনেক বেশি কার্যকর।
শালীনতা: প্রচারের ক্ষেত্রে সৌজন্য ও সুরুচির পরিচয় দেওয়া আবশ্যক।
৬. ইউটিউব ও মাল্টিমিডিয়া
মানুষের মনে রেখাপাত করার ক্ষেত্রে দৃশ্য ও শ্রবণের (অডিও-ভিডিও) প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, কুরআন তিলাওয়াত ও না’ত-এর ছোট ছোট ক্লিপ ইউটিউবে আপলোড করে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া যায়। শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক কার্টুন ও গল্পের ভিডিও তৈরি করা তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
৭. স্মার্টফোন ও মোবাইল অ্যাপস
মোবাইল এখন আর কেবল কথা বলার যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি ‘মিনি কম্পিউটার’। অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনের অ্যাপগুলোর মাধ্যমে ছালাতের সময়সূচী, মাসআলা-মাসায়েল এবং দুআসমূহ জানা এখন হাতের নাগালে।
শেয়ারিং: উপকারী অ্যাপ, পিডিএফ বই ও লেকচারসমূহ শেয়ার-ইট বা ব্লুটুথের মাধ্যমে অন্যের ফোনে ছড়িয়ে দেওয়া একটি আধুনিক ‘সদকায়ে জারিয়া’।
উদ্যোক্তাদের সহায়তা: আইফোনের জন্য ইপাব (Epub) ফরম্যাটে বাংলা ইসলামী বই নেই বললেই চলে। এই শূন্যতা পূরণে আইটি বিশেষজ্ঞ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসা ইমানি দায়িত্ব।
৮. বিজ্ঞাপন ও জনসচেতনতা
রাস্তার ধারের অশ্লীল বিলবোর্ডের বিপরীতে ইসলামের সুমহান বাণী সম্বলিত বিজ্ঞাপন স্থাপন করা যেতে পারে।
স্টিকার ও ব্যানার: বাস, ট্রেন, লঞ্চ কিংবা মসজিদের দেওয়ালে হাদীছের ছোট ছোট বাণী, সফরের দুআ কিংবা পর্দা ও ছালাত সম্পর্কিত স্টিকার লাগানো দাওয়াতের একটি অনন্য মাধ্যম।
সৃজনশীলতা: নিজের বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের সামনেও অল্প খরচে ইসলামী বাণী সম্বলিত শৈল্পিক বিলবোর্ড স্থাপন করে নীরব দাওয়াতের কাজ চালানো যায়।
মহাবিশ্বের শোভা ও আমাদের পরীক্ষা: একটি তাত্ত্বিক উপসংহার
পৃথিবীর এই চাকচিক্য, বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব উদ্ভাবন আর প্রযুক্তির মায়াবী হাতছানি—সবই মূলত এক মহান পরীক্ষার উপকরণ। পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِيْنَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلاً
“আমি পৃথিবীর ওপর যা কিছু আছে, তা কেবল তার শোভার জন্যই সৃষ্টি করেছি; যাতে আমি মানুষদের পরীক্ষা করতে পারি যে—তাদের মধ্যে কর্মে কে শ্রেষ্ঠ।” (সূরা আল-কাহফ: ০৭)
বিজ্ঞানের এই স্বর্ণযুগে ইসলামের শাশ্বত বাণী প্রচারের পদ্ধতি হতে হবে যুগোপযোগী, দল ও শৈল্পিক। সমকালীন শক্তিবৃন্দ যখন প্রযুক্তি শিক্ষায় শেখারে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তখন তাদের মোকাবিলা করার জন্য সত্যই সৈনিকদের পরিমাপ করার যোগ্যতা, ও রণকৌশল অর্জন করা সমতার সমর্থক। প্রযুক্তির মাধ্যমেকে—টেলিভিশন থেকে শুরু করে সোশ্যাল পর্যন্ত—ইসলামের সুবিধার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই অভাবনীয় বিকাশকারী ‘দাঈ ইলাল্লাহ’ বা সতর্ক পথের আহ্বানকারীদের জন্য এক অবারিত দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আজ আমাদের সামনে তাও সুযোগের মধ্যে বিশ্বময়দের অমিয় বাণী উত্সাহ। এই সুযোগকে হেলায় হারানো যাবে না। ও সুন্নাহর বিদ্রোহ শিক্ষা মানুষের বাধারে বাধা দেওয়া পার্টির সকলকে মোকাবিলা করা এবং সর্বোপরি অম্লান প্রজ্বলিত করা এখন জিনিষ সবচেয়ে বড় আমান।
ইসলামের এই ও সত্যের বিজয় নিশান উড্ডীন করতে আমাদের প্রত্যেকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। যার থেকে, শ্রম ও ক্ষমতা দিয়ে প্রযুক্তির এই ময়দানকে সত্যের পরিবর্তনে আসতে হবে। আমাদের এই প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বময় ইসলামের জয়গান গেয়ে তাওফীক দান করুন।
আমিন!
প্রকাশনা: নূরানী পথ তারিখ: ২৯ মার্চ, ২০২৬ (বাংলাদেশ)
লেখক: মুফতি সাইদুর রহমান।
ওয়েবসাইট: https://nuranipoth.online/












অসাধারণ লিখনী মাশাআল্লাহ
[…] […]