ভূমিকা

অসীম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। সময়ের বহমান স্রোতে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটে চলছি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের পানে। আমাদের প্রত্যেকের অন্তরেই নেককার হওয়ার এক সুপ্ত বাসনা থাকে, দ্বীনের আলোর প্রতি এক আত্মিক টান অনুভব করি। বারবার ভাবি, এবার নিজেকে বদলে ফেলব, প্রভুর সিজদায় লুটিয়ে পড়ব পরম সমর্পণে। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ‘বদল’ আর আসে না। দ্বীনের অগাধ জ্ঞান ও নিয়মিত নসিহত শোনার পরও কেন যেন আমলের ময়দানে আমাদের পা আটকে যায় এক অদৃশ্য শিকলে। সেই শিকলটি আর কিছুই নয়—অভিশপ্ত শয়তানের এক সুনিপুণ মায়াজাল, যা আমাদের ‘আজ’কে ‘আগামী’র অতল গহ্বরে বিসর্জন দিতে প্রলুব্ধ করে। দ্বীনদারির পথে এই মরণব্যাধি এবং শয়তানের সেই সূক্ষ্ম প্রতারণা নিয়েই আমাদের আজকের এই নিবেদন।

দ্বীনদার হওয়ার পিছনে প্রথম বাঁধা:

ইমানদার হৃদয়ে দ্বীনদারির আকাঙ্ক্ষা জাগা এক মহান নেয়ামত। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অন্তরে দ্বীনের তৃষ্ণা আছে, মুখে দ্বীনের আলোচনা আছে, তবুও আমলের ময়দানে আমরা পিছিয়ে আছি। কেন আমরা সব জেনেও প্রকৃত দ্বীনদার হতে পারছি না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, আমাদের চলার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অভিশপ্ত শয়তানের এক সুক্ষ্ম ও ভয়াবহ মরণফাঁদ— যার নাম ‘আগামীর চক্কর’।

 

শয়তান আমাদের সরাসরি পাপের পথে ডাকলে হয়তো আমরা সতর্ক হতাম, তাই সে বেছে নেয় ‘ওয়াছওয়াছা’ বা কুমন্ত্রণার পথ। সে আমাদের আমল থেকে বিমুখ করে না, বরং আমলটিকে ভবিষ্যতের গহ্বরে ঠেলে দেয়। সে কানে কানে ফিসফিস করে বলে— “এখনই কেন? এখনো তো অনেকটা সময় পড়ে আছে! আগামীতে করব, বয়স হলে করব, বার্ধক্যে থিতু হয়ে একবারে খাঁটি তওবা করে নেব।” এই যে ‘আগামীকাল’ বা ‘ভবিষ্যতের’ নেশা, এটি আসলে একটি জটিল মানসিক ব্যাধি। মুমিন মাত্রই অনুধাবন করেন যে আল্লাহর বিধান মেনে চলা উচিত, কিন্তু শয়তানি এই কুমন্ত্রণা তাকে বর্তমানের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মরীচিকার পিছে ছুটায়।

যেমন ধরুন সামর্থ্য থাকার পরও অনেকে ভাবেন, “সংসারের ঝামেলা মিটিয়ে নিই, বুড়ো বয়সে গিয়ে হজটা সেরে আসব।” কিন্তু হায়াত তো কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়! কার ডাক কখন আসবে, তা কেবল মালিকই জানেন। ফলে দেখা যায়, হজের মাহেন্দ্রক্ষণ আসার আগেই অনেকের জীবনের প্রদীপ নিভে যায়।

যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে, অথচ তারা তা আদায় না করেই মৃত্যুবরণ করল, তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাবধানবাণী অত্যন্ত কঠোর ও কম্পন সৃষ্টিকারী। তিনি ইরশাদ করেছেন:

مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَحُجَّ وَعَلَيْهِ الْحَجُّ فَلْيَمُتْ إِنْ شَاءَ يَهُودِيًّا وَإِنْ شَاءَ نَصْرَانِيًّا

অর্থাৎ: “হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি তা আদায় না করেই মারা গেল, সে ইহুদি হয়ে মরুক কিংবা নাসারা (খ্রিস্টান) হয়ে মরুক— তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই।” (সহীহ মুসলিম)

একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এই ভয়াবহ পরিণতির মূলে রয়েছে সেই একটি রোগ— “সামনে করব”। শয়তান আমাদের বর্তমানকে চুরি করে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখায়, আর এভাবেই সে আমাদের পথহারা করে রাখে।

 

উত্তরণের পথ:

ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা আমাদের হাতে নেই; যা আছে তা হলো এই ‘বর্তমান’। তাই যখনই মনে এই চিন্তা আসবে যে “পরে করব”, তখনই বুঝে নিতে হবে এটি শয়তানের আক্রমণ। এই সংশয় ও দোদুল্যমানতা থেকে মুক্তি পেতে প্রিয় নবী (সা.)-এর সেই অমিয় বাণীটি আমাদের পাথেয় হওয়া প্রয়োজন:

دَعْ مَا يُرِيبُكَ إِلَى مَا لا يُرِيبُك

অর্থাৎ: “যা তোমাকে সংশয়ে ফেলে তা পরিত্যাগ করো এবং যা তোমাকে সংশয়ে ফেলে না (নিশ্চিত বিষয়), তা গ্রহণ করো।” (আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ)

অতএব, আসুন আগামীর মিথ্যে আশ্বাসে ধোঁকা না খেয়ে, আজকের নেক আমল আজই সম্পাদন করি। কারণ শয়তানের ‘আগামীকাল’ হয়তো কোনোদিন আসবে না, কিন্তু আল্লাহর ডাক যেকোনো মুহূর্তে চলে আসতে পারে।

 

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই অমিয় বাণীর মূল শিক্ষা হলো—যা নিশ্চিত তা গ্রহণ করো, আর যা সন্দেহযুক্ত তা বর্জন করো। জীবনের প্রতিটি বাঁকে এই নীতি আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা। বিশেষ করে আমরা যারা কর্মজীবনে নিয়োজিত, তারা প্রায়ই এক দোটানায় পড়ে যাই। কেউ হয়তো ‘হাদিয়া’ বা ‘উপঢৌকন’ নিয়ে এলো; কিন্তু মনের কোণে খটকা জাগে—এটি কি সত্যিই ভালোবাসা, নাকি স্রেফ ‘উৎকোচ’ বা ঘুষের ছদ্মবেশ? ইমানের দাবি হলো, যেখানেই এমন অনিশ্চয়তা বা সন্দেহের কালো মেঘ জমবে, সেখান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। এটাই হলো প্রকৃত ‘তাকওয়া’। আর যেখানে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি অন্যায়ভাবে কাজ হাসিলের জন্য ঘুষ, সেখানে তো তা বর্জন করা ঈমানি দায়িত্ব।

 

সন্দেহ বর্জনের এই নীতি কেবল অর্থ উপার্জনেই নয়, বরং ইবাদতের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা প্রায়ই ভাবি—আগামীতে হয়তো শরীর আরও ভালো থাকবে, অবসরে যাব, হাতে অনেক টাকা আসবে, তখন প্রাণভরে ইবাদত আর দান-খয়রাত করব। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, এই ‘আগামীকাল’ কি নিশ্চিত? বার্ধক্যে আমি সুস্থ থাকব, নাকি বিছানায় পড়ে থাকব—তা কি আমি জানি? আগামীতে আমার প্রাচুর্য বাড়বে নাকি অভাব জেঁকে বসবে—তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? এমনকি আগামী সূর্যোদয় দেখার গ্যারান্টিও কি আমাদের কাছে আছে?

ইবাদতের বসন্তকাল: আজ, এখনই

সবই যেখানে অনিশ্চয়তায় ঘেরা, সেখানে নিশ্চিত হলো আমাদের এই ‘বর্তমান’। এখন আমি সুস্থ আছি, এখন আমার হাতে কিছু অর্থ আছে, এখন আমি বেঁচে আছি—এই নিশ্চিত সুযোগগুলোকে হেলায় হারানো মানেই শয়তানের চক্করে পড়া। এই ধ্রুব সত্যকেই নবীজি (সা.) কত নিপুণভাবে শিখিয়ে গেছেন:

اغتنم خمسا قبل خمس: شبابك قبل هرمك، وصحتك قبل سقمك، وغناك قبل فقرك، وفراغك قبل شغلك، وحياتك قبل موتك

অর্থাৎ: “পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি জিনিসের মূল্যায়ন করো— বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, অভাবের আগে সচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার আগে অবসরকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে।”

আমাদের এই ‘আগামীর চক্কর’ বা ঢিলেমি আসলে একটি মানসিক ব্যাধি। এই রোগসহ অন্তরের সকল কলুষতা দূর করা আমাদের পরম কর্তব্য। কারণ মানুষের বাহ্যিক আমল বা কর্ম মূলত তার অন্তরেরই প্রতিফলন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে:

ألا وإن في الجسد مضغة إذا صلحت صلح الجسد كله وإذا فسدت فسد الجسد كله ألا وهي القلب

অর্থাৎ: “জেনে রেখো, শরীরের ভেতরে একটি মাংসপিণ্ড আছে; যদি তা ঠিক হয়ে যায় তবে পুরো শরীরই ঠিক হয়ে যায়। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায় তবে পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়। মনে রেখো, সেটি হলো ‘কলব’ বা হৃদয়।” (মুসনাদে তায়ালিসি)

এই মনের রঙ কী, রূপ কী—তা আমাদের অজানা হলেও এর প্রভাব অনস্বীকার্য। মন যদি সঠিক পথে (সিরাতুল মুস্তাকিমে) থাকে, তবে মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, প্রতিটি কাজ সুশৃঙ্খল ও সঠিক ধারায় চলে আসে। আর মন যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তবে পুরো জীবনই এলোমেলো আর ভুল পথে পরিচালিত হয়। তাই জীবনের এই ছোট ছোট ভুল আর শয়তানি ধোঁকা থেকে বাঁচতে হলে সবার আগে প্রয়োজন নিজের অন্তরের পরিচর্যা এবং বর্তমান মুহূর্তকে আল্লাহর সন্তুষ্টির রঙে রাঙিয়ে তোলা।

 

দ্বীনদার হওয়ার পিছনে দ্বিতীয় বাঁধা:

 

মানুষ কেন দ্বীনদার হতে পারে না, তার দ্বিতীয় এবং অন্যতম প্রধান কারণ হলো— অশুভ পরিবেশ। মানুষের স্বভাব অনেকটা লতানো গাছের মতো; সে যে খুঁটিকে আশ্রয় করে, সেদিকেই তার বৃদ্ধি ঘটে। একটি পঙ্কিল পরিবেশ মানুষের বিবেককে কলুষিত করে দেয়, পক্ষান্তরে পবিত্র পরিবেশ তাকে আলোর পথে চলতে উদ্দীপ্ত করে। এ কারণেই মহান আল্লাহ তায়ালা যখন মুমিনদের আত্মশুদ্ধির নির্দেশ দিয়েছেন, তখন একইসাথে সৎ মানুষের সংস্পর্শে থাকারও হুকুম দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো (পরহেযগার হও) এবং সত্যবাদীদের (সৎকর্মশীলদের) সাথী হও।” (সূরা তাওবা: ১১৯)

মুফাসসিরীনে কেরাম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় একটি গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন। তারা বলেছেন, আয়াতে ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতির নির্দেশের ঠিক পরেই ‘সৎলোকদের সাথী হওয়ার’ কথা বলা হয়েছে। এর নিগূঢ় অর্থ হলো— একা একা পূর্ণাঙ্গ দ্বীনদার হওয়া কঠিন; বরং নিজেকে সংশোধন করতে হলে এমন মানুষের সাহচর্য প্রয়োজন যারা ইতিমধ্যেই আলোর পথে হাঁটছেন।

সংশ্রব বা সোহবতের বরকত কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো সাহাবায়ে কেরাম (রা.)। ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানব রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সান্নিধ্য পেয়েছিলেন বলেই তারা উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। তাঁদের এই সুউচ্চ মাকাম কোনো নিছক ব্যক্তিগত ইবাদতের ফল নয়, বরং এটি ছিল নবুয়তি সোহবতের পরশমণি।

 

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুযায়ী, একজন সাধারণ সাহাবীর মর্যাদাও কেয়ামত পর্যন্ত আসা সকল ওলী-দরবেশের সম্মিলিত ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— “হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বড় না কি বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বড়?”

উত্তরে তিনি যে অমিয় সত্যটি উচ্চারণ করেছিলেন তা ঈমানদারদের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। তিনি বলেছিলেন:

“রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে জিহাদের ময়দানে হযরত মুয়াবিয়া (রা.) যে ঘোড়ায় চড়েছিলেন, সেই ঘোড়ার খুরের সাথে মিশে থাকা ধূলিকণার মর্যাদা—হযরত আব্দুল কাদের জিলানীর (রহ.) মর্যাদার চেয়েও কোটি গুণ বেশি।” (সুবহানাল্লাহ!)

এই বক্তব্যের উদ্দেশ্য বড়পীর (রহ.)-কে ছোট করা নয়, বরং ‘সাহাবী’ হওয়ার সেই অনন্য মর্যাদাকে তুলে ধরা, যা কেবল নবীজি (সা.)-এর প্রত্যক্ষ সাহচর্যের কারণেই সম্ভব হয়েছিল।

 

হৃদয় পরিবর্তনের এক বিস্ময়কর উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে সহীহ মুসলিম শরীফে। রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তির কথা শুনিয়েছেন, যে নিরানব্বইটি প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। অপরাধের অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকেও তার অন্তরের কোনো এক কোণে সুপ্ত ছিল হিদায়াতের তৃষ্ণা। সে মুক্তি চায়, সে পবিত্র হতে চায়। এই ব্যাকুলতা নিয়ে সে তৎকালীন এক খ্রিস্টান পণ্ডিতের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল— “আমার কি তওবার কোনো পথ খোলা আছে?”

পণ্ডিত তার পাপের পাহাড় দেখে আঁতকে উঠে বলল— “অসম্ভব! নিরানব্বই খুনের পর আর ক্ষমার কোনো অবকাশ নেই।” হতাশায় মগ্ন হয়ে লোকটি ভাবল, যখন ফেরার পথ বন্ধই হয়ে গেছে, তবে শতক পূর্ণ করতে বাধা কোথায়? সে সেই পণ্ডিতকেও হত্যা করল। এভাবে তার পাপের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল একশতে।

কিন্তু অতৃপ্ত আত্মা তাকে দংশন করেই যাচ্ছিল। সে আবারও একজন বিজ্ঞ আলেমের সন্ধান পেল। সেই আলেম তাকে আশার আলো দেখিয়ে বললেন— “কে তোমার তওবার পথ আগলে রাখার সাধ্য রাখে? তবে শোনো, তুমি যে পঙ্কিল পরিবেশে থেকে এই পাপে অভ্যস্ত হয়েছ, সেই এলাকা আজই ত্যাগ করো। চলে যাও অমুক জনপদে, যেখানে একদল আল্লাহওয়ালা নেককার মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের সংস্পর্শেই তুমি তোমার হারানো আমল খুঁজে পাবে।”

লোকটি নবজন্মের আশায় সেই নেককারদের জনপদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিন্তু পথের মাঝখানেই তার জীবনের প্রদীপ নিভে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এল। মালাকুল মউতকে দেখে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তার অন্তরের সংকল্প ছিল অটল। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে সে বুক ঘষে ঘষে গন্তব্যের দিকে আরও কিছুটা এগিয়ে গেল।

 

মৃত্যুর পর এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। রহমতের ফেরেশতা আর আজাবের ফেরেশতাদের মধ্যে শুরু হলো বিতর্ক। রহমতের ফেরেশতারা তাকে জান্নাতি হিসেবে নিতে চাইল কারণ সে তওবার উদ্দেশ্যে পথে বেরিয়েছিল। আর আজাবের ফেরেশতারা তাকে জাহান্নামি হিসেবে নিতে চাইল কারণ তার আমলনামায় কোনো নেক কাজ ছিল না।

অবশেষে আল্লাহর কুদরতি ফয়সালা এল— “দুই জনপদের দূরত্ব মেপে দেখো, সে কোনটির নিকটবর্তী?” অলৌকিকভাবে দেখা গেল, লোকটি যে ভালো মানুষদের জনপদের দিকে যাচ্ছিল, সেই দিকে সে সামান্য একটু বেশি এগিয়ে আছে। সম্ভবত শেষ মুহূর্তে বুক ঘষে এগিয়ে যাওয়ার সেই সামান্য চেষ্টাই তাকে রহমতের সীমানায় পৌঁছে দিয়েছিল। ফলে রহমতের ফেরেশতারাই তার রূহ কবজ করে নিয়ে গেলেন।

 

নবীজি (সা.)-এর বর্ণিত এই ঘটনা আমাদের তিনটি অমূল্য শিক্ষা দেয়:

১. শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা: মানুষের শেষ আমলটিই হতে পারে তার নাজাতের উসিলা। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত কল্যাণের আশা ছাড়া যাবে না।

২. পরিবেশের গুরুত্ব: ভালো হতে চাইলে ভালো মানুষের সান্নিধ্যে যেতেই হবে। কুসংসর্গ ত্যাগ করে সৎ সঙ্গ গ্রহণ করাই হলো হিদায়াতের প্রথম সোপান।

৩. তওবার অবারিত দুয়ার: গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, স্রষ্টার করুণা তার চেয়েও বিশাল। পারস্যের মরমী কবি মাওলানা রুমী (রহ.)-এর ভাষায় সেই চিরন্তন আহ্বান:

 

باز آ باز آ هر آنچه هستی باز آ

گر کافر و گبر و بت‌پرستی باز آ

این درگه ما درگه نومیدی نیست

صد بار اگر توبه شکستی باز آ

 

অর্থাৎ: “ফিরে এসো, ফিরে এসো, তুমি যেমনই হও না কেন—ফিরে এসো। যদি তুমি কাফের হও, অগ্নিউপাসক কিংবা মূর্তিপূজারীও হও—তবুও ফিরে এসো। আমাদের এই দরবার হতাশার দরবার নয়; যদি শতবারও তওবা ভেঙে থাকো, তবুও তুমি ফিরে এসো।”

এখানে ‘শতবার’ বলতে সংখ্যার সীমা বোঝানো হয়নি, বরং বোঝানো হয়েছে যে আল্লাহর ক্ষমার দুয়ার বান্দার জন্য সবসময় খোলা। তিনি কেবল প্রতীক্ষায় থাকেন কখন তার অবাধ্য বান্দাটি অনুতপ্ত হৃদয়ে তার দিকে ফিরে তাকাবে।

 

অতএব, যদি আমরা সত্যিই দ্বীনদার হতে চাই, তবে আমাদের সংশ্রব বদলাতে হবে। সুগন্ধি বিক্রেতার পাশে বসলে যেমন না কিনলেও গায়ে আতরের সুবাস লাগে, তেমনি নেককার মানুষের সান্নিধ্যে থাকলে নিজের অজান্তেই অন্তরে নেক আমলের স্পৃহা জাগে। আমরা যত বেশি আল্লাহওয়ালা ও দ্বীনদার মানুষের সাথে মেলামেশার মাত্রা বাড়াব, আমাদের ভেতরের অন্ধকার তত দ্রুত বিদায় নেবে।

তাই জীবনের এই কণ্টকাকীর্ণ পথে একাকী না চলে, সত্যবাদীদের হাত ধরুন। কারণ, সৎ মানুষের একটি মুহূর্তের সাহচর্য—হাজার বছরের নির্জন ইবাদতের চেয়েও বেশি কার্যকরী হতে পারে।

 

দ্বীনদার হওয়ার পিছনে তৃতীয় বাঁধা:

দ্বীনদারির পথে আমাদের আরও একটি বড় বাধা হলো মর্যাদার ভুল মানদণ্ড। আমরা অনেকেই দ্বীনকে এবং দ্বীনের পথে চলাকে নিজের জন্য গৌরবের মনে করি না। এই মানসিক ব্যাধির কারণেই অনেক বাবা-মা সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যারিস্টার বানানোর স্বপ্নে যতটা বিভোর থাকেন, সন্তানকে একজন হাফেজ বা আলেম হিসেবে গড়ে তুলতে ততটা উৎসাহ বোধ করেন না। আমরা মনে করি, জাগতিক বড় ডিগ্রি থাকলেই সমাজে ইজ্জত বাড়বে, অথচ দ্বীনদার হওয়া বা দ্বীনের পথে থাকাকে আভিজাত্যের অন্তরায় মনে করা হয়। এই ‘মর্যাদার ভ্রান্ত রেখা’ আমাদের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের কাছে পাওয়া ক্ষণস্থায়ী সম্মানের চেয়ে মহান আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াই হলো প্রকৃত আভিজাত্য।

 

অনেক সময় আমরা মানুষের সমালোচনার ভয়ে দ্বীন পালন থেকে বিরত থাকি। “দাড়ি রাখলে লোকে হুজুর বলবে,” “সুন্নত লেবাস পরলে লোকে মান্ধাতা আমলের ভাববে”— এই জাতীয় হীনম্মন্যতা আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। আমরা মানুষের সমালোচনার ভয়কে ‘লজ্জা’ মনে করি, অথচ এটি লজ্জা নয় বরং এক প্রকার ঈমানি দুর্বলতা।

প্রকৃত লজ্জা হলো আল্লাহর কাছে লজ্জা পাওয়া। মানুষের ভয়ে ইবাদত ত্যাগ করা বা গুনাহে লিপ্ত হওয়া আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়। এই বিষয়ে প্রিয় নবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে অত্যন্ত চমৎকার একটি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন:

اسْتَحْيُوا مِنَ اللَّهِ حَقَّ الْحَيَاءِ

অর্থাৎ: “তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে লজ্জা করো।” (সুনানে তিরমিযী)

সাহাবীগণ বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা তো আল্লাহকে লজ্জা করি।” তখন নবীজি (সা.) প্রকৃত লজ্জার পরিচয় দিয়ে বললেন— “আল্লাহকে লজ্জা করার অর্থ হলো নিজের মাথা ও মগজকে (চিন্তা ও দৃষ্টিকে) গুনাহ থেকে রক্ষা করা, পেট ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট অঙ্গকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং মৃত্যু ও কবরের কথা সর্বদা স্মরণে রাখা। যে ব্যক্তি আখেরাত চায়, সে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে আখেরাতকে প্রাধান্য দেয়। মূলত এটিই হলো আল্লাহকে লজ্জা করার প্রকৃত অর্থ।”

দ্বীনদার হওয়ার পিছনে চতুর্থ বাঁধা:

 

দ্বীনদার হওয়ার পথে আমাদের একটি বড় ভুল ধারণা হলো— দ্বীনদারি কেবল ব্যক্তিগত বিষয়। অথচ একজন মুমিনের জন্য তার পরিবার ও সন্তানদের দ্বীনের পথে গড়ে তোলা অপরিহার্য কর্তব্য। আমরা অনেক সময় অন্যের সমালোচনার ভয়ে কুঁকড়ে থাকি, কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা তাদের ধর্মীয় পোশাক বা আচার পালনে কতটা অবিচল। শিখরা পাগড়ি পরে, হিন্দুরা তিলক বা সিঁদুর পরে; তারা কে কী বলল তার পরোয়া করে না। অথচ আমরা মুসলমান হয়েও অনেক সময় ধর্মীয় পোশাক বা দাড়ি রাখতে হীনম্মন্যতায় ভুগি। এই হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলে দ্বীনকে নিজের ও পরিবারের জন্য সম্মানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

পরিবারের কর্তা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

অর্থাৎ: “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

 

সন্তানকে দ্বীনদার বানানোর পদক্ষেপ নিতে হবে শৈশব থেকেই। অনেক বাবা-মা ভাবেন, “সন্তান তো এখনো ছোট, বড় হলে শিখবে।” এই শিথিলতা মারাত্মক ভুল। সাত বছর বয়স হলে সন্তানকে নামাজের আদেশ দিতে হবে এবং দশ বছর বয়সে প্রয়োজনে শাসন করে অভ্যস্ত করতে হবে। এই বয়সে তারা বালেগ না হলেও, ছোটবেলা থেকে অভ্যাসের মাধ্যমেই তারা আগামীর নেককার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।

সন্তান যখন পনেরো, বিশ বা পঁচিশ বছরে পা দেয়, তখনো অনেক বাবা-মা তাদের ‘ছোট’ মনে করে বিয়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যান। মনে রাখতে হবে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যদি তাদের বিয়ের ব্যবস্থা না করা হয় এবং তারা কোনো পাপে লিপ্ত হয়, তবে সেই পাপের বোঝা বাবা-মাকেও বহন করতে হবে।

 

 

দ্বীনদার হওয়ার পিছনে পঞ্চম বাঁধা:

 

মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রায় বা দ্বীনদারির পথে সবচেয়ে বড় অদৃশ্য বাধা হলো সম্পদের প্রতি সীমাহীন আসক্তি। ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘হুব্বে মাল’। এই মোহ যখন মানুষের হৃদয়ে জেঁকে বসে, তখন সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে; ভুলে যায় হালাল ও হারামের চিরাচরিত সীমারেখা।

 

আল্লাহ তায়ালা মানুষের এই অন্তহীন প্রতিযোগিতার স্বভাব সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ

“প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ পাও।” (সূরা তাকাছুর: ১-২)

অর্থাৎ, মানুষ এই মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যায়, অথচ তার তৃষ্ণা মেটে না।

 

রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটের চিত্র এঁকেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। তিনি বলেছেন:

“আদম সন্তানকে যদি স্বর্ণভর্তি একটি উপত্যকা দিয়ে দেওয়া হয়, তবে সে দ্বিতীয় আর একটির আকাঙ্ক্ষা করবে। মূলত কবরের মাটি ছাড়া আর কিছুই তার মুখ ভরাতে পারবে না।” (বুখারী ও মুসলিম)

অন্য একটি হাদিসে আরও সূক্ষ্ম এক সত্য উন্মোচিত হয়েছে। মানুষ যখন বৃদ্ধ হয়, তখন তার শরীরের সব শক্তি ক্ষয় হতে থাকে, কিন্তু দুটি জিনিস উত্তরোত্তর তরুণ ও শক্তিশালী হতে থাকে:

সম্পদের লোভ

দীর্ঘায়ু হওয়ার আশা

আমরা অনেকেই ভাবি, “এখন একটু কামিয়ে নিই, পরে শান্তিতে ইবাদত করব।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্পদ যত বাড়ে, লোভের ক্ষুধা তত বৃদ্ধি পায়। এটি যেন নোনা জল পানের মতো—যত পান করা হয়, তৃষ্ণা তত বাড়ে।

আমরা সাধারণত অভাবকে ভয় পাই, কিন্তু রাসূল (সা.) উম্মতের জন্য প্রাচুর্যকে বেশি ভয় করেছেন। তিনি বলেছেন:

“আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করি না। বরং আমি ভয় করি যে, তোমাদের সামনে দুনিয়ার প্রাচুর্য অবারিত করে দেওয়া হবে—যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য দেওয়া হয়েছিল। ফলে তোমরা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে এবং তা তোমাদের ধ্বংস করে দেবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

কেন সম্পদ বেশি বিপজ্জনক?

অভাব মানুষকে অনেক সময় পাপের পথ থেকে আটকে রাখে সামর্থ্য নেই বলে। কিন্তু অঢেল সম্পদ মানুষের হাতে পাপের যাবতীয় উপকরণ ও সরঞ্জাম তুলে দেয়। সম্পদ থাকলে অহংকার আসে, আর অহংকার মানুষকে মহান রবের স্মরণ থেকে বিচ্যুত করে দেয়।

 

হাকীমুল উম্মত মাওলানা রুমী (রহ.) সম্পদ ও মানুষের সম্পর্ককে একটি কালজয়ী উপমার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। তিনি বলেন:

آب اندر زیر کشتی پشتی است، آب در کشتی هلاک کشتی است।

“নৌকা চলার জন্য পানির আধার প্রয়োজন। পানি যতক্ষণ নৌকার নিচে থাকে, ততক্ষণ তা নৌকাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই পানিই যখন নৌকার ভেতরে প্রবেশ করে, তখন তা নৌকাকে ডুবিয়ে দেয়।”

আমাদের জীবনটা হলো একটি ‘ঈমানি তরী’। দুনিয়ার সম্পদ হলো সেই তরী চালানোর ‘পানি’। জীবন অতিবাহিত করার জন্য সম্পদ জরুরি, কিন্তু সেই সম্পদকে যখন আমরা তলে (প্রয়োজনে) না রেখে অন্তরের ভেতরে (লোভ হিসেবে) স্থান দিই, তখন আমাদের ঈমানি তরী পাপাচারের ভারে নিমজ্জিত হয়।

ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি। জুমার নামাজের পর আল্লাহ তায়ালা জমিনে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো—সম্পদ যেন হাতের মুঠোয় থাকে, অন্তরের মণিকোঠায় নয়। সম্পদের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করা বুদ্ধিমত্তা, কিন্তু তাকে ইলাহ বা উপাস্য বানিয়ে ফেলা ধ্বংসের নামান্তর।

তাই আসুন, আমরা জীবনতরীকে সচল রাখতে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সম্পদ আহরণ করি, কিন্তু লোভের লোনা জল যেন আমাদের হৃদয়ে ঢুকে ঈমানকে ডুবিয়ে না দেয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি।

 

উপসংহার:

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—আমরা ‘আগামীকাল’ নামক এক মরীচিকার পিছে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ‘আজ’কে হারিয়ে ফেলি। আমরা ভাবি, আজ নয়, আগামীতে ভালো হয়ে যাব; এখন নয়, বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর পথে ফিরে আসব। কিন্তু খোদা না করুন, এই দীর্ঘসূত্রতা আর কালক্ষেপণের মাঝেই যদি মৃত্যুর পরোয়ানা জারি হয়ে যায়, তবে আমাদের সামনে অনন্তকালের আফসোস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

কিয়ামতের কঠিন ময়দানে যখন আমলনামা পেশ করা হবে, তখন মহান আল্লাহ তায়ালা ধমক দিয়ে অপরাধীদের বলবেন:

أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ

অর্থাৎ: “আমি কি তোমাদেরকে এতটুকু বয়স দেইনি, যাতে কেউ উপদেশ গ্রহণ করতে চাইলে তা পারতো? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারীও এসেছিল।” (সূরা ফাতির: ৩৭)

সেদিন কোনো ওজর-আপত্তি আর কাজে আসবে না। যারা নিজেদের ওপর অবিচার করে সময়ের অপচয় করেছে, সেদিন তাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো, সময় থাকতেই নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া এবং আজকেই প্রভুর সিজদায় লুটিয়ে পড়া। আল্লাহ পাক সময় থাকতে আমাদের বোধোদয় দান করুন।

আসুন, আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে এই মিনতি জানাই:

اللَّهُمَّ أَلْهِمْنَا مَرَاشِدَ أُمُورِنَا وَأَعِذْنَا مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আলহিমনা মারাশিদা উমুরিনা, ওয়া আইযনা মিন শুরুরি আনফুসিনা ওয়া মিন সাইয়্যিআতি আমালিনা।

অনুবাদ: “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য যা কল্যাণকর ও সঠিক, সেই চিন্তা ও কাজের তৌফিক আমাদের অন্তরে ঢেলে দিন। আমাদের নফসের কুটিলতা এবং আমাদের আমলের মন্দ দিকগুলো থেকে আমাদের হেফাজত করুন।”

আমিন।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

আপনার জন্য আরও কিছু প্রয়োজনীয় পাঠ:

প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here