ভূমিকা: এক অস্থির সময়ের উপাখ্যান

সূচিপত্র

বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত ও রহস্যময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আমরা যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়গানে মুখর, ঠিক তখনই পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য বা আরব ভূখণ্ড আজ যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। এই অস্থিরতা কি কেবলই ক্ষমতার লড়াই? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছর আগের কোনো অলৌকিক সংকেত?

সম্প্রতি ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব সংক্রান্ত কিতাবাদি অধ্যয়ন করতে গিয়ে একটি শিহরণ জাগানিয়া শিরোনামে চোখ আটকে যায়—“মাহদীর আবির্ভাবের পূর্বে আকাশপথে বোমাবর্ষণ”। এই শিরোনাম এবং সংশ্লিষ্ট হাদীসের বর্ণনা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে যে আয়নায় আমাদের সামনে দাঁড় করায়, তা কেবল একজন মুমিনকেই নয়, বরং যেকোনো বিবেকবান মানুষকে থমকে দিতে বাধ্য করে।

প্রয়োজন ইহুদীর, হামলা খৃস্টানের: ভূ-রাজনীতির নেপথ্য খেলা

বর্তমান আরব বিশ্বের দিকে তাকালে একটি বিচিত্র সমীকরণ নজরে আসে। সেখানে রাজনৈতিক স্বার্থ আর ধর্মীয় বিদ্বেষ এমনভাবে মিশে গেছে যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল সত্য উদঘাটন করা কঠিন। আমরা দেখছি, স্বার্থসিদ্ধি হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর, কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অন্য শক্তি।

আরব ভূখণ্ড আজ ছিন্নভিন্ন। সেখানে মানবিকতা ধুঁকছে, আর ক্ষমতার নেশায় উন্মত্ত শাসকরা যেন এক অজানা গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই যে বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা, যেখানে বড় বড় শক্তিগুলো একজোট হয়ে একটি নির্দিষ্ট জনপদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তা যেন সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনারই অংশ।

হাদীসের আলোকে ‘ডানা-বিশিষ্ট’ ধ্বংসযজ্ঞ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো কিয়ামত পর্যন্ত আসা মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে হাদীসটি আপনি উল্লেখ করেছেন, তার প্রতিটি শব্দ বর্তমান সময়ের আধুনিক সমরাস্ত্রের এক বিস্ময়কর বর্ণনা বহন করে। হাদীসে বলা হয়েছে:

أَبِي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه قَالَ: «وَيْلٌ لِلْعَرَبِ، وَيْلٌ لَهُمْ مِنْ هَرَجٍ عَظِيمٍ، الْأَجْنِحَةُ وَمَا الْأَجْنِحَةُ، وَالْوَيْلُ فِي الْأَجْنِحَةِ، رِيَاحٌ قَفَا هُبُوبِهَا، وَرِيَاحٌ تُحَرِّكُ هُبُوبِهَا، وَرِيَاحٌ تُرَاخِي هُبُوبِهَا، أَلَا وَيْلٌ لَهُمْ مِنَ الْمَوْتِ السَّرِيعِ وَالْجُوعِ الْفَظِيعِ وَالْقَتْلِ الذَّرِيعِ

আরবদের জন্য ধ্বংস! এক ভয়াবহ অস্থিরতা ও হত্যাযজ্ঞ তাদের গ্রাস করবে। সেখানে ব্যবহৃত হবে এমন কিছু ‘ডানা-বিশিষ্ট’ বস্তু, কী ভয়ংকর সেই ডানা! ঐ ডানাগুলোর মধ্যেই রয়েছে ধ্বংস…”মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক 

চৌদ্দশ বছর আগে যখন এই কথাগুলো বলা হয়েছিল, তখন মানুষের কাছে যুদ্ধ মানে ছিল তলোয়ার আর ঘোড়া। কিন্তু হাদীসে উল্লিখিত ‘الأجنحة’ (ডানা-বিশিষ্ট বস্তু) শব্দটির গভীরতা আজ আমরা বুঝতে পারছি। আকাশপথে উড়ে আসা যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং মিসাইলগুলো কি সেই ‘ডানা-বিশিষ্ট’ ধ্বংসের বার্তাবাহক নয়?

হাদীসের বর্ণনায় বাতাসের তিনটি অবস্থার কথা এসেছে—প্রচণ্ড, গতিশীল এবং ধীর। আধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল বা সুপারসনিক জেটের গতির সাথে এর মিল খুঁজে পাওয়া কি খুব কঠিন? যখন আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা বর্ষিত হয়, তখন তা কেবল জনপদই ধ্বংস করে না, বরং বাতাসের স্তরে সৃষ্টি করে এক ভয়াবহ আলোড়ন।

মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ ও নির্মম গণহত্যা: বর্তমান গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য

হাদীসের শেষ অংশে তিনটি ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে: আকস্মিক মৃত্যু, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং নির্মম গণহত্যা।

আজকের ফিলিস্তিন, সিরিয়া বা ইয়েমেনের দিকে তাকালে এই কথাগুলোর জীবন্ত প্রতিফলন দেখা যায়।

আকস্মিক মৃত্যু: উন্নত প্রযুক্তির ড্রোনের মাধ্যমে মানুষ বুঝে ওঠার আগেই তার ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ: অবরোধের মাধ্যমে একটি পুরো জাতিকে খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত করে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

নির্মম গণহত্যা: কোনো বাছবিচার ছাড়াই নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, যা আধুনিক সভ্যতার কপালে এক বড় কলঙ্ক।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমন বার্তা ও আমাদের করণীয়

উলামায়ে কেরাম এবং গবেষকগণ বর্তমান এই পরিস্থিতিকে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। ফিতনার এই ঘনঘটা যখন চারপাশ অন্ধকার করে দেয়, তখনই আল্লাহ তাআলা উম্মাহর জন্য একজন পথপ্রদর্শক পাঠান।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল ভবিষ্যৎবাণী মিলিয়ে দেখাই মুমিনের কাজ নয়। বরং এই ফিতনা সংকুল সময়ে নিজেদের ঈমান রক্ষা করা এবং আসন্ন প্রতিকূলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করাই আসল বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন ফিতনার সময় ধৈর্য ধারণ করতে এবং আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে।

এটি কি কেবলই কাকতালীয়?

অনেকে বলতে পারেন, এটি হয়তো কেবল ইতিহাসের একটি পুনরাবৃত্তি। কিন্তু ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান সময়ের এই মিলগুলো অনেক বেশি নিখুঁত। প্রযুক্তির এই উৎকর্ষ আর তার মাধ্যমে আকাশপথের এই ধ্বংসলীলা ইতিপূর্বে আর কখনো দেখেনি বিশ্ব। তাই এটিকে কেবল কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সময় আমাদের সামনে এক চরম সত্যকে উন্মোচন করছে, যা আমাদের আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ডাক দিচ্ছে।

আরো পড়ুন

দ্বীনী শিক্ষার্থীদের প্রতি নসিহত। নূরানী পথ‌‌‌।

প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: এই আর্টিকেলে উল্লিখিত হাদীসটি কি সহীহ? এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু?

উত্তর: আর্টিকেলে ব্যবহৃত হাদীসটি মূলত “ফিতান” বা শেষ জামানার ভবিষ্যৎবাণী সংক্রান্ত কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.)-এর ‘আল-হাভী লিল-ফাতাভী’ বা ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর কিতাবুন্নিনহায়া-তে এই ধরনের বর্ণনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ফিতান সংক্রান্ত অনেক হাদীসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে মতভেদ থাকে। কিছু হাদীস সহীহ, কিছু হাসান এবং কিছু যঈফ বা দুর্বল হতে পারে। এই নির্দিষ্ট হাদীসটি বর্তমান সময়ের পরিস্থিতির সাথে মিলে যাওয়ায় গবেষকগণ এটিকে সতর্কবাণী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে মূল হাদীস গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং উলামায়ে কেরামের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রশ্ন ২: হাদীসে বর্ণিত ‘ডানা-বিশিষ্ট বস্তু’ দিয়ে কি কেবল ড্রোন বা যুদ্ধবিমানই বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: না, হাদীসের শব্দ ‘الأجنحة’ (ডানা-বিশিষ্ট বস্তু) একটি ব্যাপক শব্দ। রাসূলুল্লাহ (সা.) চৌদ্দশ বছর আগে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানে ভবিষ্যতের ভয়াবহ সমরাস্ত্রের একটি রূপক বর্ণনা দিয়েছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ড্রোন, যুদ্ধবিমান, মিসাইল বা দূরপাল্লার রকেট—এগুলোর সবকটিরই ‘ডানা’ বা পাখা রয়েছে এবং এগুলো আকাশপথেই ধ্বংসলীলা চালায়। তাই আধুনিক এই সমরাস্ত্রগুলো এই ভবিষ্যৎবাণীর অন্তর্ভুক্ত হওয়া যৌক্তিক।

প্রশ্ন ৩: এই অস্থিরতা কি ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের একদম চূড়ান্ত লক্ষণ? তিনি কি এখনই আত্মপ্রকাশ করবেন?

উত্তর: রাসূলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের বা ইমাম মাহদীর (আ.) আগমনের কিছু ছোট লক্ষণ এবং কিছু বড় লক্ষণের কথা বলেছেন। বর্তমানের এই পরিস্থিতি, বিশেষ করে আরব বিশ্বে অরাজকতা এবং আকাশপথে হামলার মতো ঘটনাগুলো ‘ছোট লক্ষণ’-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অনেক ছোট লক্ষণ ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.) কখন আসবেন তার সুনির্দিষ্ট সময় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। তবে এই লক্ষণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা সেই সময়ের দিকে ধাবিত হচ্ছি এবং আমাদের ঈমানী প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রশ্ন ৪: হাদীসে বর্ণিত ‘ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ’ এবং ‘নির্মম গণহত্যা’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে কীভাবে ঘটছে?

উত্তর: ফিলিস্তিনের গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেন বা সুদানের মতো দেশগুলোর দিকে তাকালে এই দুটি বিষয়ের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। সেখানে কেবল বোমাবর্ষণই হচ্ছে না, বরং অবরোধের মাধ্যমে খাবার, পানি ও ঔষধ বন্ধ করে কৃত্রিমভাবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতিদিন নারী, শিশু ও নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনেও গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত। হাদীসের এই বর্ণনাগুলো যেন এই বর্তমান সময়েরই মানচিত্র।

প্রশ্ন ৫: বর্তমান বিশ্বের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ মুসলমানের প্রধান করণীয় কী?

উত্তর: এই ফিতনার সময়ে প্রধান করণীয় হলো তিনটি:

১. ঈমান রক্ষা করা: যাবতীয় শিরক, বিদআত এবং হারাম কাজ থেকে নিজেকে দূরে রেখে ঈমানকে মজবুত করা।

২. তওবা ও আত্মশুদ্ধি: নিজের পাপের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া এবং নিজের চরিত্র ও আচরণকে ইসলামের আলোকে সংশোধন করা।

৩. ধৈর্য ও দুআ: যেকোনো পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং মজলুম মানবতার জন্য এবং নিজেদের হিফাজতের জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করা। এছাড়াও সাধ্য অনুযায়ী ফিতনা থেকে দূরে থাকা এবং জ্ঞান অর্জন করা।

উপসংহার: হিফাজতের প্রার্থনা

পরিশেষে, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে ফিতনা রাতের অন্ধকারের মতো আমাদের গ্রাস করছে। আকাশপথে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়া বোমার আঘাত আর চারদিকে আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অমোঘ সত্যকে—আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আমাদের আর কোনো আশ্রয় নেই।

হে আল্লাহ! আপনি মুসলিম উম্মাহকে হিফাজত করুন। আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন এবং আসন্ন যাবতীয় ফিতনা থেকে আমাদের ঈমান ও আমলকে নিরাপদ রাখুন। ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের যেন হকের পথে অবিচল থা

কার তাওফিক দান করেন। আমিন।

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here