মুমিনের মর্যাদার সোপান: নবীজীর (সা.) প্রিয় ইবাদত তাহাজ্জুদ
রাতের নিস্তব্ধতায় যখন পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন মহান রবের দরবারে হাজিরা দেওয়াই হলো মুমিনের প্রকৃত শরাফত। তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি হলো আল্লাহর প্রেমাস্পদ হওয়ার এক অনন্য সোপান।
হযরত আয়েশা (রা.) একবার বিস্ময় নিয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন এত কষ্ট করছেন? অথচ আপনার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে!”
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ইবাদত করার কারণে প্রিয়নবী (সা.)-এর পা মোবারক ফুলে যেত। সেই অনুযোগের উত্তরে নবীজী (সা.) যে ঐতিহাসিক ও হৃদয়স্পর্শী বাক্যটি বলেছিলেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকবে। তিনি বলেছিলেন:
أَفَلاَ أُحِبّ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا شَكُورًا
“আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়া পছন্দ করবো না?” (সহীহ বুখারী: ৪৮৩৭, সহীহ মুসলিম: ২৮২০)
সফলতার চাবিকাঠি ও জান্নাতের পথ
আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই মহিমান্বিত সালাত রাসূলে কারীম (সা.) কখনো ত্যাগ করেননি। এমনকি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে ছুটে গেলে তিনি দিনের বেলা তা কাযা আদায় করে নিতেন। তিনি নিজে যেমন এই নফল ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন, তেমনি সাহাবায়ে কেরামকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উৎসাহিত করতেন। কারণ তাহাজ্জুদ হলো:
- মুমিনের মর্যাদার সিঁড়ি: যা একজন সাধারণ মানুষকে আল্লাহর খাস বান্দায় পরিণত করে।
- জান্নাতের নিশ্চয়তা: পরকালীন জীবনে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
- আল্লাহর সান্নিধ্য: অন্তরের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির শ্রেষ্ঠ চাবিকাঠি।
আরো পড়ুন
ইবাদতে মন বসানোর উপায় ও আল্লাহর মহব্বত লাভের কার্যকর আমল
তাহাজ্জুদ মুমিনের প্রকৃত আভিজাত্য: জিবরীল (আ.)-এর সেই অমূল্য নসিহত
ওহীর বাহক হযরত জিবরীল (আলাইহিস সালাম) যখনই আরশ থেকে জমিনে আসতেন, নিয়ে আসতেন হিদায়াতের অমীয় সুধা। একবার তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে এমন এক জীবনদর্শন তুলে ধরলেন, যা একজন মুমিনের যাপিত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হাদিসের কিতাবগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, জিবরীল (আ.) আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন:
يَا مُحَمّدُ! شَرَفُ الْمُؤْمِنِ قِيَامُ اللّيْلِ وَعِزّهُ اسْتِغْنَاؤُه عَنِ النّاس
“হে মুহাম্মাদ! মুমিনের প্রকৃত মর্যাদা নিহিত রয়েছে ‘কিয়ামুল লাইল’ বা রাতের ইবাদতের মধ্যে; আর তার সম্মান হলো মানুষের কাছে হাত না পাতা বা অমুখাপেক্ষিতার মধ্যে।” (মুসতাদরাকে হাকেম: ৭৯২১)
এই উপদেশের গূঢ় রহস্য
এই একটি বাণীর মাঝে জিবরীল (আ.) মুমিনের জন্য দুটি অমূল্য রত্ন লুকিয়ে রেখেছেন:
- আধ্যাত্মিক আভিজাত্য: দুনিয়ার মানুষের কাছে পদ-পদবি বা অর্থবিত্ত আভিজাত্যের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে মুমিনের আসল ‘শরাফত’ বা আভিজাত্য হলো রাতের নিস্তব্ধতায় জায়নামাজে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলা। যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, তখন যে বান্দা মালিকের সামনে দাঁড়ায়, আরশের অধিপতি তাকে এক অনন্য সম্মানে ভূষিত করেন।
- ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা: মানুষের কাছে হাত না পাতা বা অমুখাপেক্ষী থাকা মুমিনকে এক অপার্থিব ‘ইজ্জত’ বা আত্মমর্যাদা দান করে। যে কেবল আল্লাহর কাছেই চায়, তাকে আর কারো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় না।
তাহাজ্জুদ: সম্মান ও সফলতার রাজপথ
তাহাজ্জুদ নামাজ এটি একজন মুমিনকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তোলার এক স্বর্গীয় কারিগর। যে রাতে জেগে রবের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে, দিনের আলোয় আল্লাহ তার চেহারায় এক বিশেষ নূর দান করেন এবং মানুষের অন্তরে তার জন্য এক অদৃশ্য ভালোবাসা শ্রদ্ধা সৃষ্টি করে দেন।
ফরয নামাযের পরেই তাহাজ্জুদের স্থান
পাঁচ ওয়াক্ত নামায মুমিনের পরিচয়। এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর পরই যে নামায আল্লাহর কাছে প্রিয় তা হল তাহাজ্জুদ। হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদীস; নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلاَةُ اللّيْلِ.
রমযানের পর রোযা রাখার উত্তম সময় মুহাররম মাস আর ফরয নামাযের পর উত্তম নামায রাতের নামায, অর্থাৎ তাহাজ্জুদ। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭২৫
হৃদয়ের প্রশান্তি ও আরশের সান্নিধ্য: যে আমল নবীজী (সা.) কখনো ছাড়েননি
পৃথিবীতে প্রিয় জিনিসের মায়া ত্যাগ করা কঠিন, কিন্তু সেই প্রিয় জিনিস যদি হয় মহান রবের সাথে নিভৃতে কথোপকথন, তবে মুমিনের কাছে রাতের ঘুম বিসর্জন দেওয়াটাই হয়ে ওঠে পরম তৃপ্তির। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে তাহাজ্জুদ ছিল এমনই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা তাঁর ঈমানি দৃঢ়তা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাত।
পা ফুলে যেত, তবুও চলত ইবাদত
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর যবান থেকেই শুনুন সেই প্রেমময় ইবাদতের বিবরণ। উরওয়া (রাহ.) বর্ণনা করেন, হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন—
كَانَ يَقُومُ مِنَ اللّيْلِ، حَتّى تَتَفَطّرَ قَدَمَاهُ، فَقَالَتْ عَائِشَةُ: لِمَ تَصْنَعُ هَذَا يَا رَسُولَ اللهِ, وَقَدْ غَفَرَ اللهُ لَكَ مَا تَقَدّمَ مِنْ ذَنبکكَ وَمَا تَأَخّرَ؟ قَالَ: أَفَلاَ أُحِبّ أَنْ أَكُونَ عَبْدًا شَكُورًا.
(নবীজী) রাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এত বেশি নামায পড়তেন যে, তাঁর পাও মোবারক ফুলে যেতো। এ দেখে তিনি (আয়েশা রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এত কষ্ট করছেন, অথচ আপনার পূর্বাপর সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমার কি উচিত নয় যে, (এই মহা অনুগ্রহের জন্য আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে) আমি একজন পূর্ণ শোকর আদায়কারী বান্দা হব?’ > — সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৮৩৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৮২০
অসুস্থতাও যাকে থামাতে পারেনি
প্রিয়নবী (সা.) এই আমলকে তিনি তাঁর জীবনের এক অপরিহার্য রুটিন বানিয়ে নিয়েছিলেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি রেওয়ায়েতে এসেছে— রোগ-ব্যাধি কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করতে না পারতেন, তবে দিনের বেলায় বারো রাকাত আদায় করে নিতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৪৬)
উম্মতের প্রতি আয়েশা (রা.)-এর বিশেষ অসিয়ত
রাতের এই ইবাদত যেন উম্মতের কেউ হাতছাড়া না করে, সেজন্য হযরত আয়েশা (রা.) সাহাবায়ে কেরামকে বিশেষভাবে তাগিদ দিতেন। আবদুল্লাহ ইবনে কাইস (রা.)-কে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন—
ياعَبْدَ اللهِ لاَ تَدَعْ قِيَامَ اللّيْلِ، فَإنّ النّبِيّ صَلّى الله عَلَيْهِ وَসَلّمَ مَا كَانَ يَدَعُهُ وَكَانَ إِذَا مَرِضَ أَوْ كَسِلَ صَلّى قَاعِدًا.
হে আবদুল্লাহ! কিয়ামুল লাইল কখনো ছেড়ো না! কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা কখনো ছাড়েননি। কখনো অসুস্থতা বা দুর্বলতা বোধ করলে বসে আদায় করতেন। > — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩০৯
পাপের কালিমা মুছে দেয় যে মহিমান্বিত আলো
মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ছোট-বড় নানা ভুলে জড়িয়ে পড়ি। এই ভুলের ভার যখন আত্মার ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশান্তির খোঁজে তাহাজ্জুদের জায়নামাজই হতে পারে শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। তাহাজ্জুদ কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং গোনাহর পাহাড় ধুয়ে ফেলার এক ঐশী ঝরনাধারা।
সালেহীনদের পথ ও রবের নৈকট্য
হযরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাহাজ্জুদের এই অলৌকিক প্রভাব সম্পর্কে আমাদের পথনির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন:
عَلَيْكُمْ بِقِيَامِ اللّيْلِ فَإِنّهُ دَأَبُ الصّالِحِينَ قَبْلَكُمْ، وَهُوَ قُرْبَةٌ إِلَى رَبِّكُمْ، وَمَكْفَرَةٌ لِلسّيِّئَاتِ، وَمَنْهَاةٌ لِلإِثْمِ.
“তোমরা কিয়ামুল লাইল বা রাতের ইবাদতের প্রতি যত্নবান হও। কেননা তা তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার বান্দাদের (সালেহীন) চিরন্তন অভ্যাস এবং তোমাদের রবের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম। আর এই আমল মানুষের পাপরাশি মোচন করে এবং তাকে নতুন করে গোনাহে লিপ্ত হওয়া থেকে বাধা প্রদান করে।” — জামে তিরমিযি, হাদীস ৩৫৪৯; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ১১৫৬
তাহাজ্জুদের ত্রিবিধ উপকারিতা
উপরিউক্ত হাদীসের আলোকে তাহাজ্জুদের তিনটি বিশেষ গুণ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়:
১. পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকার: এটি যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা আল্লাহওয়ালা ও সালেহীনদের অন্যতম প্রধান আমল। যারা আল্লাহর প্রিয় হতে চেয়েছেন, তারা রাতের নিস্তব্ধতাকেই বেছে নিয়েছেন।
২. পাপের প্রায়শ্চিত্ত: রাতের অন্ধকার যখন গভীর হয়, তখন নির্জনে দু’ফোঁটা চোখের পানি অতীতের সমস্ত গোনাহর কালিমা ধুয়ে হৃদয়কে স্বচ্ছ করে দেয়।
৩. গোনাহ থেকে ঢাল: যে ব্যক্তি নিয়মিত তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে এমন এক নূর দান করেন যা তাকে পরবর্তী সময়ে মন্দ কাজ ও পাপাচার থেকে নিরাপদ রাখে।
কিয়ামুল লাইল: পবিত্র কুরআনের দর্পণে জান্নাতীদের পরিচয়
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন। যারা জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম লাভ করবেন, তাঁদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রাতের নিস্তব্ধতায় রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়া। এটি কেবল একটি আমল নয়, বরং এটি হলো জান্নাতীদের বিশেষত্বের মোহর।
মুত্তাকীদের সেই রাতের প্রার্থনা
সূরা যারিয়াতে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের জন্য চিরস্থায়ী সুখের ঘোষণা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
اِنَّ الْمُتَّقِیْنَ فِیْ جَنّٰتٍ وَّ عُیُوْنٍ
“নিশ্চয়ই মুত্তাকীরা সেদিন থাকবে প্রস্রবণবিশিষ্ট জান্নাতে।” — সূরা যারিয়াত (৫১) : ১৫
জান্নাতী হওয়ার এই রাজকীয় সনদের পাশাপাশি আল্লাহ তাঁদের বিশেষ একটি গুণের কথা উল্লেখ করেছেন, যা তাঁদের অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে:
هُمْ یَسْتَغْفِرُوْن بِالْاَسْحار
“রাতের শেষ প্রহরে (যখন পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন) তারা তাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত।” — সূরা যারিয়াত (৫১): ১৮
ইবাদুর রহমান: রহমানের প্রিয় বান্দাদের পরিচয়
সূরা ফুরকানে আল্লাহ তাঁর খাস বান্দাদের একটি তালিকা দিয়েছেন, যাঁদের তিনি ‘ইবাদুর রহমান’ বা দয়াময়ের বান্দা বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁদের সেই মহিমান্বিত জীবনের বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
وَ الَّذِیْنَ یَبِیْتُوْنَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَّ قِیَامًا
“আর তাঁরা রাত অতিবাহিত করে তাঁদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সিজদারত অবস্থায় এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।” — সূরা ফুরকান (২৫) : ৬৪
সবর ও জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ
রাতের ঘুম বিসর্জন দিয়ে যারা এই কঠোর সবর বা ধৈর্য ধারণ করেন, তাঁদের সেই ত্যাগের মহিমা আল্লাহ বৃথা যেতে দেন না। সূরার শেষ প্রান্তে তাঁদের সেই অভাবনীয় পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে:
اُولٰٓىِٕكَ یُজْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوْا وَ یُلَقَّوْنَ فِیْهَا تَحِیَّةً وَّ سَلٰمًا، خٰلِدِیْنَ فِیْهَا حَسُنَتْ مُসْتَقَرًّا وَّ مُقَامًا
“তাদের প্রতিদান দেয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ; কারণ তারা ছিল ধৈর্যশীল। তাদেরকে সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে অভিবাদন ও সালাম সহকারে। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে তা কত উৎকৃষ্ট!” — সূরা ফুরকান (২৫) : ৭৫-৭৬
কিয়ামুল লাইল: জান্নাত লাভ ও মর্যাদা বৃদ্ধির রাজপথ
মদীনার আকাশে যখন ইসলামের নূর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল, তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখ নিঃসৃত প্রথম বাণীগুলো ছিল মানবতার মুক্তি এবং জান্নাতের পথনির্দেশক। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) যখন প্রথমবার নবীজীর নূরানী চেহারা মোবারক দেখলেন, তখনই তাঁর অন্তরাত্মা বলে উঠেছিল— “এ কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা হতে পারে না।” নিরাপদ জান্নাতের চার চাবিকাঠি
সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনসমক্ষে যে কালজয়ী নসিহত করেছিলেন, তা ছিল এই:
يَا أَيّهَا النّاسُ، أَفْشُوا السّলাَمَ، وَأَطْعِمُوا الطّعَامَ، وَصَلّوا وَالنّাসُ نِيَامٌ تَدْخُلُونَ الجَنّةَ بِسَلاَمٍ.
“হে লোকসকল! সালামের প্রসার ঘটাও, মানুষকে আহার করাও এবং রাতে মানুষ যখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন তোমরা নামায (তাহাজ্জুদ) আদায় করো; তবেই তোমরা পরম শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।” — জামে তিরমিযি: ২৪৮৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৫১
জান্নাতের সেই স্বচ্ছ ও অলৌকিক প্রাসাদ
যারা রাতের নিস্তব্ধতায় রবের সান্নিধ্য খুঁজে নেয়, তাদের জন্য জান্নাতে অপেক্ষা করছে এমন এক বিশেষ মর্যাদা, যা সাধারণ কল্পনার অতীত। হযরত আবু মালেক আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতের সেই অপূর্ব প্রাসাদের বিবরণ দিয়ে ইরশাদ করেন:
إِنّ فِي الْجَنّةِ غُرْفَةً يُرَى ظَاهِرُهَا مِنْ بَاطِنِهَا، وَبَاطِنُهَا مِنْ ظَاهِرِهَا أَعَدّهَا اللهُ لِمَنْ أَطْعَمَ الطّعَامَ، وَأَلَانَ الْكَلَامَ، وَتَابَعَ الصِّيَامَ وَصَلّى وَالنّাসُ نِيَامٌ.
“নিশ্চয়ই জান্নাতে এমন কিছু বিশেষ কক্ষ বা প্রাসাদ রয়েছে, যার বাহির থেকে ভেতরের অংশ এবং ভেতর থেকে বাইরের অংশ দেখা যায় (অর্থাৎ অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নূরানী)। আল্লাহ তাআলা এই প্রাসাদগুলো তাঁদের জন্যই প্রস্তুত রেখেছেন, যারা— মানুষকে খাবার খাওয়ায়, কোমল ভাষায় কথা বলে, নিয়মিত রোযা রাখে, সালামের প্রসার ঘটায় এবং রাতে মানুষ যখন ঘুমে বিভোর থাকে তখন তারা নামাযে দণ্ডায়মান হয়।” — মুসনাদে আহমাদ: ২২৯০৫; সহীহ ইবনে হিব্বান: ৫০৯
হৃদয়স্পর্শী শিক্ষা: এই হাদীসগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জান্নাত কেবল একটি গন্তব্য নয়, এটি হলো পরিশ্রম আর প্রেমের ফসল। যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে নিথর হয়ে যায়, তখন যে বান্দা বিছানা ত্যাগ করে মালিকের সামনে দাঁড়ায়, সেই মূলত জান্নাতের সেই কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ প্রাসাদের প্রকৃত হকদার।
কিয়ামুল লাইল: আধ্যাত্মিক পূর্ণতার কিছু জরুরি আদব
যে কোনো বিশেষ সাক্ষাতের জন্য যেমন প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তেমনি আরশের অধিপতির সাথে নিভৃতে কথা বলার জন্যও রয়েছে কিছু চমৎকার সুন্নাহসম্মত আদব। এই আদবগুলো পালনের মাধ্যমে তাহাজ্জুদের নূর ও বরকত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
১. ঘুম থেকে উঠে আলস্য দূর করা ও দুআ পড়া
ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজ হলো মহান রবের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং জড়তা কাটিয়ে তোলা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের আমল বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
… اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، فَجَلَسَ يَمْسَحُ النّوْمَ عَنْ وَجْهِهِ بِيَدِهِ، ثُمّ قَرَأَ العَশْرَ الآيَاتِ الخَوَاتِمَ مِنْ سُورَةِ آلِ عِمْرَانَ.
“…রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে উঠে বসে পড়লেন এবং দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ও চোখ মুছে ঘুমের ঘোর দূর করলেন। এরপর তিনি সূরা আলে ইমরানের শেষ দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৬৩
২. মিসওয়াক ও পবিত্রতা অর্জন
তাহাজ্জুদের অন্যতম প্রধান আদব হলো মুখ পরিষ্কার করা। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই তাহাজ্জুদের জন্য উঠতেন, পরম গুরুত্বের সাথে মিসওয়াক করতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৩৬)
মিসওয়াকের গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত আলী (রা.) এক বিস্ময়কর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
إِذَا قَامَ مِنَ اللّيْلِ فَتَسَوّكَ ثُمّ تَوَضّأَ ثُمّ قَامَ إِلَى الصّلَاةِ جَاءَهُ الْمَلَكُ حَتّى يَقُومَ خَلْفَهُ يَسْتَمِعُ الْقُرْآنَ فَلَا يَزَالُ يَدْنُو مِنْهُ حَتّى يَضَعَ فَاهُ عَلَى فِيهِ فَلَا يَقْرَأُ آيَةً إِلّا دَخَلَتْ جَوْفَهُ.
“যখন কেউ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য ওঠে এবং মিসওয়াক ও ওযু করে সালাতে দাঁড়ায়, তখন একজন ফিরিশতা তার তিলাওয়াত শোনার জন্য পেছনে এসে দাঁড়ান। ফিরিশতা ক্রমাগত তার নিকটবর্তী হতে থাকেন; একপর্যায়ে তিনি এত নিকটে চলে আসেন যে, নিজের মুখ ঐ ব্যক্তির মুখের ওপর রেখে দেন। তখন মুমিন যা তিলাওয়াত করে, তা সরাসরি ফিরিশতার উদরে প্রবেশ করে।” — মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ১৮১০
ইবাদতের সূচনা: হালকা দুই রাকাতের মাধ্যমে
যেকোনো বড় কাজের শুরুতে যেমন একটি প্রস্তুতিমূলক ধাপ থাকে, তেমনি তাহাজ্জুদের দীর্ঘ ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার আগে শরীর ও মনকে প্রস্তুত করে নিতে হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ হলো—তাহাজ্জুদের মূল ও দীর্ঘ কিরাতের নামায শুরু করার আগে সংক্ষিপ্ত এবং হালকা দুই রাকাত আদায় করে নেওয়া।
নবীজী (সা.)-এর চিরন্তন অভ্যাস
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাতের ইবাদতের সূচনা সম্পর্কে বলেন:
افْتَتَحَ صَلاَتَهُ بِرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ।
“(নবীজী) শুরুতে হালকা করে দুই রাকাত আদায় করতেন।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭৫৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৬৬৮২
উম্মতের প্রতি নবীজীর নির্দেশনা
এটি কেবল নবীজীর ব্যক্তিগত আমলই ছিল না, বরং তিনি তাঁর উম্মতকেও একইভাবে শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ مِنَ اللّيْلِ، فَلْيَفْتَتِحْ صَلاَتَهُ بِرَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ।
“তোমাদের কেউ যখন রাতে ইবাদতের জন্য উঠবে, সে যেন প্রথমে হালকা দুই রাকাতের মাধ্যমে তার নামায শুরু করে।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৬৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩২৩
কেন এই সংক্ষিপ্ত সূচনা?
১. জড়তা দূর করা: ঘুমের রেশ কাটিয়ে পুরোপুরি মনোযোগ ও একাগ্রতা ফিরিয়ে আনতে এই দুই রাকাত অত্যন্ত কার্যকর।
২. মানসিক প্রস্তুতি: দীর্ঘ কিরাত ও দীর্ঘ সিজদার আগে নিজেকে ইবাদতের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলা।
৩. সুন্নাহর অনুসরণ: ছোট ছোট সূরা দিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে এই দুই রাকাত আদায় করা নবীজীর পছন্দের পদ্ধতি।
নিয়মিত আমল: ইবাদতের মাধুর্য ও স্থায়িত্ব
তাহাজ্জুদ এমন এক অমূল্য রতন, যা একবার কেউ অর্জন করলে তা আর হারানো উচিত নয়। আমাদের উচিত যথাসম্ভব নিয়মিত এই আমলটি জারি রাখা এবং কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া তা পরিত্যাগ না করা। কারণ, মহান আল্লাহর নিকট সেই আমলটিই সবচেয়ে দামী, যা বান্দা বিরতিহীনভাবে পালন করে।
আল্লাহর নিকট প্রিয় আমলের মানদণ্ড
অনেকে হয়তো ভাবেন, একদিন অনেক ইবাদত করে কয়েকদিন বিরত থাকাই যথেষ্ট। কিন্তু রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন আমলের গুণগত মান ও ধারাবাহিকতার গুরুত্ব। হাদীসে এসেছে:
أَحَبّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلّ.
“আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়; যদিও তা পরিমাণে সামান্য হয়।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৬৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৪২
অবিরাম পথে চলার প্রেরণা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-কে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত মমতা ও সতর্কতার সাথে একটি উপদেশ দিয়েছিলেন। এই উপদেশটি আজ আমাদের সবার জন্য এক বড় সতর্কবাণী। তিনি বলেছিলেন:
يَا عَبْدَ اللهِ، لاَ تَكُنْ بِمِثْلِ فُلاَنٍ كَانَ يَقُومُ اللّيْلَ فَتَرَكَ قِيَامَ اللّيْلِ.
“হে আব্দুল্লাহ! তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না; সে নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করত, কিন্তু পরবর্তীতে তা ছেড়ে দিয়েছে।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৭০৩
কেন নিয়মিত আমল জরুরি?
১. ঈমানের দৃঢ়তা: নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায় করলে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক মজবুত হয় এবং ঈমানি শক্তি বৃদ্ধি পায়।
২. হৃদয়ের প্রশান্তি: প্রতিদিনের এই আমল অন্তরে এক অপার্থিব প্রশান্তি ও নূর তৈরি করে, যা অনিয়মিত আমলে পাওয়া কঠিন।
৩. বিপদমুক্ত থাকা: নিয়মিত ইবাদতকারীকে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের বিভিন্ন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন।
পরামর্শ: যদি কোনো রাতে পুরো সময় জেগে থাকা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত দুই রাকাত হলেও নিয়মিত আদায় করা উচিত। যাতে কিয়ামুল লাইল আদায়কারীদের তালিকা থেকে আমাদের নাম মুছে না যায়।
ইবাদতে ভারসাম্য: তাহাজ্জুদ ও ফরযের অগ্রাধিকার
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। এখানে নফল ইবাদতের যেমন বিশাল মর্যাদা রয়েছে, তেমনি ফরয ইবাদতকে তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় অতি উৎসাহে আমরা সারারাত নফল ইবাদতে কাটিয়ে দিই, কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঘুমের চাপে ফরয নামাযই ছুটে যায়—যা মোটেও কাম্য নয়।
ফজরের জামাত বনাম সারারাত জাগরণ
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা আমাদের এই ভারসাম্য শেখায়। একবার তিনি ফজরের জামাতে হযরত সুলায়মান ইবনে হাসমা (রা.)-কে দেখতে না পেয়ে তাঁর মায়ের কাছে খোঁজ নিলেন। মা জানালেন, ছেলে সারারাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়েছে, তাই ভোরের দিকে ঘুমে তলিয়ে গেছে। তখন উমর (রা.) এক কালজয়ী উক্তি করেছিলেন:
لأن أشهد صلاة الصبح في الجماعة أحব إلي من أن أقوم ليلة.
“সারা রাত জেগে (নফল) সালাত আদায় করার চেয়ে ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়া আমার নিকট অধিক প্রিয়।” — মুয়াত্তা মালিক, হাদীস ৭
শরীরের অধিকার ও ঘুমের চাপ
ইবাদত হতে হবে একাগ্রচিত্তে। যদি ঘুমের তীব্র চাপে আপনি বুঝতে না পারেন কী তিলাওয়াত করছেন, তবে সেই অবস্থায় জোর করে নামায পড়া উচিত নয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصّلاَةِ فَلْيَرْقُدْ حَتّى يَذْهَبَ عَنْهُ النّوْمُ، فَإِنّ أَحَدَكُمْ إِذَا صَلّى وَهُوَ نَاعِسٌ لَعَلّهُ يَذْهَبُ يَسْتَغْفِرُ، فَيَسُبّ نَفْسَهُ.
“যদি (রাতের) নামাযে কারো তন্দ্রা আসে, তবে সে যেন শুয়ে যায় যতক্ষণ না তার ঘুম দূর হয়। কেননা ঘুমের ঘোরে সে হয়তো ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে ভুলে নিজেকেই গালি দিয়ে বসতে পারে।” — সহীহ বুখারী, হাদীস ২১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭৮৫
একইভাবে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত অন্য একটি হাদীসে নবীজী (সা.) ইরশাদ করেছেন:
إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ مِنَ اللّيْلِ، فَاسْتَعْجَمَ الْقُرْآنُ عَلَى لِسَانِهِ، فَلَمْ يَدْرِ مَا يَقُولُ، فَلْيَضْطَجِعْ.
“যখন কেউ রাতে নামাযে দাঁড়াল, কিন্তু (ঘুমের কারণে) তার জিহ্বায় কুরআন তিলাওয়াত জড়িয়ে যাচ্ছে এবং সে কী বলছে তা নিজেও বুঝতে পারছে না, তবে সে যেন শুয়ে পড়ে।” — সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৮৭
শিক্ষণীয় বার্তা:
আল্লাহর ইবাদত হতে হবে সজাগ মস্তিষ্কে এবং প্রফুল্ল চিত্তে। নফলের কারণে যেন ফরয ইবাদতে বিঘ্ন না ঘটে, সেদিকে লক্ষ্য রাখাই হলো প্রকৃত মুমিনের বুদ্ধিমত্তা। পরিমিত বিশ্রাম নিয়ে একাগ্রতার সাথে দুই রাকাত তাহাজ্জুদ পড়া, তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সারারাত জেগে থাকার চেয়ে উত্তম।
সপরিবারে তাহাজ্জুদ: ঘরে ঘরে জান্নাতী আবহ
তাহাজ্জুদ কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক উন্নতির মাধ্যম নয়, বরং এটি পারিবারিক জীবনে আল্লাহর রহমত ও বরকত নামিয়ে আনার এক ঐশী চাবিকাঠি। একা জান্নাতের পথে না হেঁটে যদি জীবনসঙ্গীকে নিয়ে এই নূরানী পথে চলা যায়, তবে সেই পরিবারটি হয়ে ওঠে মহান রবের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
দম্পতিদের জন্য নবীজী (সা.)-এর বিশেষ দুআ
রাতের ইবাদতে একে অপরকে সহযোগিতা করার মাঝে যে কতটা কল্যাণ লুকিয়ে আছে, তা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পবিত্র দুআ থেকেই স্পষ্ট হয়। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
رَحِمَ اللهُ رَجُلًا قَامَ مِنَ اللّيْلِ فَصَلّى، ثُمّ أَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَصَلّتْ، فَإِنْ أَبَتْ نَضَحَ فِي وَجْهِهَا الْمَاءَ، وَرَحِمَ اللهُ امْرَأَةً قَامَتْ مِنَ اللّيْلِ فَصَلّتْ، ثُمّ أَيْقَظَتْ زَوْجَهَا فَصَلّى، فَإِنْ أَبَى نَضَحْتَ فِي وَجْهِهِ الْمَاءَ.
“সে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ রহম করুন, যে রাতে উঠে সালাত আদায় করে, তারপর স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয় এবং সেও সালাত আদায় করে। স্ত্রী যদি উঠতে না চায় তখন তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে হলেও উঠানোর চেষ্টা করে। তদ্রূপ ওই নারীর প্রতি আল্লাহ রহম করুন, যে রাতে উঠে সালাত আদায় করে তারপর স্বামীকে জাগিয়ে দেয় এবং স্বামী উঠে সালাত আদায় করে। স্বামী উঠতে না চাইলে চেহারায় পানি ছিটিয়ে হলেও তাকে উঠানোর চেষ্টা করে।” — সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১৩০২; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৩৬
যাকিরীনের তালিকায় নাম লিখানোর সুযোগ
স্বামী-স্ত্রী যদি রাতে একে অপরের হাত ধরে জান্নাতের পথে এগিয়ে যায়, তবে তাদের জন্য আসমানে এক বিশেষ সম্মানের ঘোষণা দেওয়া হয়। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
مَنِ اسْتَيْقَظَ مِنَ اللّيْلِ وَأَيْقَظَ امْرَأَتَهُ فَصَلّيَا رَكْعَتَيْنِ جَمِيعًا كُتِبَا مِنَ الذّاكِرِينَ اللهَ كَثِيرًا وَالذّاكِرَاتِ.
“যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্য রাতে ওঠে এবং স্ত্রীকেও জাগিয়ে দেয়; অতঃপর দুজনে একসাথে দুই রাকাত নামায আদায় করে, তবে তাদেরকে সেই ‘যাকিরীন’ ও ‘যাকিরত’ (আল্লাহর যিকিরকারী নারী ও পুরুষ)-দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যারা আল্লাহকে অনেক বেশি স্মরণ করে।” — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৩০৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৩৫
পারিবারিক প্রশান্তির উৎস
১. আল্লাহর রহমত: স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাগিয়ে তুললে সেই ঘরে আল্লাহর বিশেষ রহমত বর্ষিত হয়।
২. পারস্পরিক ভালোবাসা: যখন কোনো দম্পতি রবের সামনে একসাথে সিজদাবনত হয়, তখন তাদের মাঝে এক জান্নাতী ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।
৩. যিকিরকারীদের মর্যাদা: ব্যস্ত দুনিয়ায় যারা রাতের শেষ প্রহরে রবের কথা ভুলে যায় না, আল্লাহ নিজ কুদরতে তাদের নাম স্মরণ করেন।
কিয়ামুল লাইল হোক জীবনের চিরস্থায়ী অংশ
পবিত্র রমজান মাস ছিল মুমিনের জন্য আমলের এক উর্বর বসন্ত। সিয়াম ও কিয়ামের মাধ্যমে আমরা আমাদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার যে সুযোগ পেয়েছিলাম, তা যেন কেবল এক মাসের ফ্রেমে বন্দি হয়ে না থাকে। রমজানে সেহরির বরকতময় সময়ে আমরা অনেকেই তাহাজ্জুদের স্বাদ আস্বাদন করেছি। রমজান বিদায় নিলেও সেই আধ্যাত্মিক সুধা পানের সুযোগ কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি।
রমজানের শিক্ষা ও আমলের ধারাবাহিকতা
প্রথিতযশা আলেম ও উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক ছাহেব (হাফিযাহুল্লাহ) এই বিষয়ে অত্যন্ত সুনিপুণ এক জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন:
“রমজান বিদায় হয়ে যাচ্ছে ঠিক, কেউ চাইলেও সেটি আর ধরে রাখতে পারবে না। কারণ সেটি হেলাল (চাঁদ) দিয়ে শুরু হয়, হেলাল দিয়ে শেষ হয়। কাজেই এটি ধরে রাখার উপায়ও নেই। কিন্তু যেটি ধরে রাখা সম্ভব সেটি হলো রমজানের আমল এবং আছার (প্রভাব) ধরে রাখা। রমজানে রোযা, তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ এবং যিকির-আযকার—এগুলোর প্রতি অন্তরে যে ভালোলাগা তৈরি হয়েছে, আল্লাহর প্রতি যে ভালোবাসা এবং ভয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটি জাগ্রত রাখা।”
তিনি আরও গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন:
“রমজানের ফরয রোযা অন্য মাসে পাওয়া যাবে না, বাকি সবকিছুই আগের মতো। ফরয রোযা না থাকলেও নফল রোযা আছে বছরময়। তারাবীহ নেই, কিন্তু তাহাজ্জুদ আছে বারো মাস।” — মাজালিসে ইতেকাফ, পৃ. ২০৪
সংকল্প ও প্রস্তুতি: আমল শুরুর প্রথম সোপান
যেকোনো মহৎ কাজের মূল শক্তি হলো হৃদয়ের গভীর থেকে নেওয়া একটি দৃঢ় সংকল্প বা নিয়ত। তাহাজ্জুদের মতো মহিমান্বিত আমলটি নিজের জীবনে স্থায়ী করতে হলে আমাদের এখনই নিয়ত করে ফেলা প্রয়োজন। রমজানের সেই অর্জিত অভ্যাসকে বারো মাসের পাথেয় করতে হলে নিয়ত এবং কিছু কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. নিয়তের অলৌকিক শক্তি
মুমিনের নিয়ত কেবল একটি মানসিক ইচ্ছাই নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। বিশুদ্ধ নিয়তের বরকতে আল্লাহ তাআলা অনেক সময় কাজ না করেও আমলের সওয়াব দান করেন। তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত কার্যকর। হযরত আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
مَنْ أتى فِراشَه وَهُوَ يَنْوي أن يّقُومَ يُصلِّي مِنَ اللّيلِ فغلبتْهُ عَيْناه حَتّى أصْبحَ، كُتبَ لَه مَا نَوى، وَكانَ نومُهُ صدَقةً عَلَيْهِ مِنْ رّبِّه – عز وجল
“যে ব্যক্তি রাতে নামায পড়ার নিয়ত করে বিছানায় গেল, কিন্তু ঘুমের চাপে উঠতে পারল না এবং সকাল হয়ে গেল, তবে তার নিয়তের কারণে আমলনামায় নামাযের সওয়াব লিখে দেওয়া হবে। আর তার এই ঘুম মহান রবের পক্ষ থেকে তার জন্য সদাকা হিসেবে গণ্য হবে।” — সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১৭৮৭
অর্থাৎ, আপনার প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক হয়, তবে আপনি কোনো রাতে উঠতে না পারলেও আল্লাহর মেহেরবানিতে বঞ্চিত হবেন না।
২. আরামদায়ক বিছানা: একটি সূক্ষ্ম প্রতিবন্ধকতা
বিছানা যদি মাত্রাতিরিক্ত কোমল ও আরামদায়ক হয়, তবে শেষ রাতে ওঠার ইচ্ছা অবচেতন মনেই দমে যায়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে আমাদের জন্য এখানে এক বড় শিক্ষা রয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) একবার নবীজীর বিছানাটি একটু বেশি নরম করার জন্য চার ভাঁজ করে বিছিয়ে দিয়েছিলেন। সকালে নবীজী (সা.) সেই বিছানার কোমলতা নিয়ে সতর্ক করে দিলেন। তিনি বললেন:
رُدّوْهُ لِحالَتِهِ الأوْلى فإنّه مَنَعَتْنِي وَطاءَتُه صَلاتِيَ اللّيْلَةَ.
“বিছানাটি আগের মতো করে দাও! কারণ এর অতিরিক্ত কোমলতা আমাকে আজ রাতে (তাহাজ্জুদ) নামায থেকে বিরত রেখেছে।” — শামায়েলে তিরমিযি, হাদীস ৩৩০
আমলি শিক্ষা:
১. তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত: তাহাজ্জুদের অভ্যাস শুরু করতে আজ রাতের জন্যই শক্ত নিয়ত করুন।
২. বিলাসিতা ত্যাগ: বিছানা এবং পরিবেশ এমন রাখা উচিত যা ইবাদতে সহায়ক হয়, গাফিলতি বা অতি-বিলাসিতা যেন আমাদের রবের সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
আরাম বিসর্জন: প্রভুর সান্নিধ্যে যাওয়ার পথে প্রথম ত্যাগ
ইবাদতের স্বাদ পেতে হলে মাঝেমধ্যে দেহের আরামকে বিসর্জন দিতে হয়। বিছানা যখন মাত্রাতিরিক্ত কোমল ও আরামদায়ক হয়, তখন শেষ রাতে রবের ডাকে সাড়া দেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে এখানে এক বিস্ময়কর শিক্ষা রয়েছে।
বিছানার কোমলতা ও নবীজীর (সা.) সতর্কতা
উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.) একবার নবীজীর বিছানাটি একটু বেশি আরামদায়ক করার জন্য দুই ভাঁজের পরিবর্তে চার ভাঁজ করে বিছিয়ে দিয়েছিলেন। সকালে আল্লাহর রাসূল (সা.) যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন তিনি এক অনন্য বার্তা দিলেন। তিনি বললেন:
رُدّوْهُ لِحالَتِهِ الأوْلى فإنّه مَنَعَتْنِي وَطاءَتُه صَلاتِيَ اللّيْلَةَ.
“এটি আগের মতো (সাধারণ) করে দাও! কারণ এর অতিরিক্ত কোমলতা আজ রাতে আমাকে নামায (তাহাজ্জুদ) থেকে বিরত রেখেছে।” — শামায়েলে তিরমিযি, হাদীস ৩৩০
গভীর রাতে রবের সান্নিধ্য ও অমূল্য সুযোগ
যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন—ঠিক তখনই মহাবিশ্বের অধিপতি তাঁর বান্দার সবচেয়ে কাছে চলে আসেন। সেই মুহূর্তে যে বান্দা বিছানা ত্যাগ করে মালিকের দুয়ারে দাঁড়ায়, তার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে হতে পারে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الرّبّ مِنَ العَبْدِ فِي جَوْفِ اللّيْلِ الآخِرِ، فَإِنْ اسْتَطَعْتَ أَنْ تَكُونَ مِمّنْ يَذْكُرُ اللهَ فِي تِلْكَ السّاعَةِ فَكُنْ.
“রাতের শেষভাগে মহান রব তাঁর বান্দার অত্যন্ত নিকটবর্তী হন। সুতরাং তুমি যদি সক্ষম হও, তবে সেই সময়ে আল্লাহর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।” — জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৭৯; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১২৭৭
অনুপ্রেরণা:
শেষ রাতের এই সময়টি হলো দুআ কবুলের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। স্বয়ং আল্লাহ যখন নিকটবর্তী হয়ে বান্দাকে ডাকেন, তখন আরামের বিছানা আঁকড়ে না থেকে জায়নামাজে লুটিয়ে পড়াই হলো মুমিনের প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা। এই ক্ষুদ্র ত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয় রবের চিরস্থায়ী সন্তুষ্টি ও জান্নাতী আভিজাত্য।
রাতের শেষ প্রহর: যখন স্বয়ং রব আপনাকে ডাকছেন!
আল্লাহ আমার ডাকে সাড়া দেবেন তো? আমার গোনাহ কি ক্ষমা হবে?—এই ব্যাকুলতা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে থাকে। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্রতিদিন এমন একটি মুহূর্ত আসে যখন খোদ আরশের অধিপতি দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দার ক্ষমার জন্য ব্যাকুল হয়ে তাকে ডাকতে থাকেন? সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি হলো রাতের শেষ প্রহর।
আসমান থেকে রবের সেই সুমধুর ডাক
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর এই বিশেষ রহমতের বর্ণনা দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
يَنْزِلُ رَبّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلّ لَيْلَةٍ إِلَى السّمَاءِ الدّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِي، فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ।
“আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং ঘোষণা দেন— কে আছো, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছো, যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তাকে তা দান করব। কে আছো, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।” — সহীহ বুখারী: ১১৪৫; সহীহ মুসলিম: ৭৫৮
স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা যখন দুয়ার খুলে ডাকছেন, তখন তাঁর দরবারে হাজিরা দেওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হলো তাহাজ্জুদ। এই সালাতের মাধ্যমে যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়, তা মুমিনকে সরাসরি রবের মাগফিরাতের চাদরে আবৃত করে নেয়।
উপসংহার: রমজানের নূর ছড়িয়ে পড়ুক বারো মাস
পবিত্র রমজান বিদায় নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সে আমাদের হৃদয়ে রোপণ করে দিয়ে গেছে আমলের এক জীবন্ত বীজ। দীর্ঘ এক মাস সেহরির জন্য ওঠার যে অনুশীলন আমরা করেছি, তা কেবল রমজানে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য নয়; বরং সারা বছর তাহাজ্জুদে অভ্যস্ত হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ ছিল এটি।
আসুন, রমজানের এই শুভ অভ্যাসটিকে হারতে না দিই। শেষ রাতে যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, তখন দুই-চার রাকাত নামাযে দাঁড়িয়ে রবের কাছে রোনাজারি করি। চোখের দু’ফোঁটা পানি দিয়ে মনের সকল অপ্রাপ্তি আর গোনাহের বোঝা ধুয়ে ফেলি। আল্লাহর নৈকট্য ও মাগফিরাত লাভে ধন্য হওয়ার এই তো শ্রেষ্ঠ সময়।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়ের তাওফীক দান করুন এবং আমাদের ইবাদতগুলোকে কবুল করে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।











