ভূমিকা
ইসলামে পরিবারিক ব্যবস্থার মূলে রয়েছে পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব। আমরা সাধারণত পিতা-মাতার অধিকার নিয়ে সচেতন থাকলেও, অনেকে জানি না পিতা-মাতার ওপর সন্তানের অধিকারও ইসলামি শরিয়তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সন্তান কেবল মা-বাবার নয়নমণিই নয়, বরং তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক পবিত্র আমানত।
একটি শিশুকে সুস্থ, শিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা পিতা-মাতার কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। আজকের আলোচনায় আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামে সন্তানের অধিকার এবং তাদের প্রতি মা-বাবার গুরুদায়িত্বগুলো সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
আরো পড়ুন
ইবাদতে মন বসানোর উপায় ও আল্লাহর মহব্বত লাভের কার্যকর আমল
সন্তানের গুরুত্ব ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
পৃথিবীর প্রতিটি গৃহের কোণে কোণে প্রতিধ্বনিত হওয়া সবচেয়ে মধুর শব্দ হলো শিশুর কল-কাকলি। প্রতিটি দম্পতিই তাদের সংসারে একটি ফুটফুটে সন্তানের আগমন কামনা করেন। সন্তান কেবল বংশের প্রদীপই নয়, বরং তারা গৃহের শ্রী ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রধান উৎস। যে ঘরে শিশুর চঞ্চল পদচারণা নেই, সে ঘরের নির্জনতা যেন এক বিষণ্ণতার প্রতিচ্ছবি। শিশুর এই মায়াবী রূপ ও গুরুত্ব সম্পর্কে জনৈক কবি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বলেছেন—
إِنَّمَا أَوْلاَدُنَا بَيْنَنَا * أَكْبَادُنَا تَمْشِىْ عَلَى الْأَرْضِ
لَوْ هَبَّتِ الرِّيْحُ عَلَى بَعْضِهِمْ * لاَمْتَنَعَتْ عَيْنِىْ عن الْغُمْضِ
“আমাদের সন্তানেরা তো আমাদেরই কলিজার টুকরো, যারা মাটির বুকে হেঁটে বেড়ায়। যদি কখনও তাদের গায়ে সামান্য দমকা হাওয়াও লাগে, তবে আমাদের চোখের ঘুম চিরতরে বিদায় নেয়।” 1
সন্তান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠ নেয়ামত
ইসলামি শরীয়তে সন্তানকে মহান আল্লাহ তাআলার অগণিত নেয়ামতের মাঝে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা আলূসী (রহ.)-এর মতে, ধন-সম্পদ যেমন মানুষের জীবন ধারণের উপকরণ, তেমনি সন্তান-সন্ততি হলো মানব প্রজাতি ও বংশধারা রক্ষার সুশোভিত মাধ্যম।
সন্তান কেবল আনন্দদায়ক নয়, বরং তারা পিতা-মাতার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত এক পবিত্র আমানত। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী সালমান ফারেসী (রা.)-এর একটি ঐতিহাসিক উক্তি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য:
إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَإِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، وَلِأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا، فَأَعْطِ كُلَّ ذِىْ حَقٍّ حَقًّهُ
“নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার প্রতিপালকের হক রয়েছে, তোমার নিজের শরীরের হক রয়েছে এবং তোমার পরিবারেরও হক রয়েছে। অতএব, প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার আদায় করো।”
পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বক্তব্য শুনে সমর্থন দিয়ে বলেছিলেন, “সালমান সত্য বলেছে।” (সহিহ বুখারি)। মূলত মানব সন্তান পশু-পাখির মতো নয়; তারা পরম মমতা ও আদর-যত্ন ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে না।
সন্তান লাভ: মহান রবের একক কর্তৃত্ব
সন্তান লাভ করা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন। পৃথিবীতে অনেকের অঢেল সম্পদ থাকলেও তারা সন্তানের জন্য হাহাকার করেন, আবার অনেকে অভাবের মাঝেও বহু সন্তানের জনক হন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ يَهَبُ لِمَنْ يَّشَاءُ إِنَاثاً وَّيَهَبُ لِمَن يَّشَاءُ الذُّكُوْرَ- أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَاناً وَّإِنَاثاً وَّيَجْعَلُ মَنْ يَّشَاءُ عَقِيْماً إِنَّهُ عَلِيْمٌ قَدِيْرٌ
“আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন; অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছা তিনি বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (সূরা শূরা: ৪৯-৫০)3
পিতা-মাতার যৌথ দায়বদ্ধতা
একটি শিশুকে সুস্থ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা পিতা-মাতা উভয়েরই সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশু পৃথিবীতে আসে এক নিষ্পাপ ও নির্মল ফিতরাত (প্রকৃতি) নিয়ে। তাকে সুনাগরিক করার জন্য নৈতিক ও মানসিক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَا مِنْ مَوْلُوْدٍ إِلاَّ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ
“প্রতিটি শিশুই ফিতরাতের (ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতাই তাকে ইহুদী, খ্রিষ্টান বা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে।” (সহিহ বুখারি)
সাধারণত উপার্জনের দায়ভার ও কঠোর শাসনের দায়িত্ব পিতার ওপর থাকলেও, সন্তানের লালন-পালন ও প্রাথমিক শিক্ষার মতো ধৈর্যসাধ্য কাজগুলো মায়ের স্নেহময় আঁচলের নিচেই সম্পন্ন হয়। এভাবে পিতা ও মাতা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেন।
ইসলামে সন্তানের এই অধিকারগুলোকে আমরা প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করতে পারি:
১. মাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত অধিকার।
২. পিতার নিকট থেকে প্রাপ্ত অধিকার।
মাতার নিকট থেকে সন্তানের প্রাপ্য অধিকার
ইসলামি জীবনদর্শনে সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্ববোধ যেমন অতুলনীয়, তেমনি সন্তানেরও মায়ের কাছে কিছু অকাট্য অধিকার রয়েছে। এই অধিকারগুলোকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
(ক) গর্ভকালীন বা জন্মপূর্ব অধিকার।
(খ) জন্ম-পরবর্তী অধিকার।
(ক) গর্ভকালীন অধিকারসমূহ
সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই মায়ের ওপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। গর্ভে থাকাকালীন একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের আচার-আচরণ ও জীবনধারার মাধ্যমে।
(ক)১. আনন্দের সাথে গর্ভধারণ ও নিরাপত্তা:
সন্তানকে গর্ভে ধারণ করা কেবল একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর এক বিশেষ দান। একজন মা তার অনাগত সন্তানকে হাসিমুখে এবং পরম মমতায় গ্রহণ করবেন। অনাগত শিশুকে কোনোভাবেই আপদ বা ‘বোঝা’ মনে করে বিনষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না। বরং নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তাকে নিরাপদে রাখা মায়ের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মায়ের এই ত্যাগ ও কষ্টের কথা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত দরদ দিয়ে বলা হয়েছে:
حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ
“তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছেন।” (সূরা লোকমান: ১৪)
২. দৈহিক গঠন ও পুষ্টির অধিকার:
গর্ভস্থ সন্তানের শারীরিক সুস্থতা ও সঠিক গঠন নির্ভর করে মায়ের খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন চলাফেরার ওপর। এ সময় মাকে খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে যাতে সন্তানের কোনো ক্ষতি না হয়। পুষ্টিকর ও হালাল খাবার গ্রহণ করা মায়ের ওপর সন্তানের একটি হক। আল্লাহ তাআলা বিবি মারয়াম (আ.)-কে কঠিন কষ্টের সময়েও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন:
وَهُزِّىْ إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَاقِطْ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا- فَكُلِيْ وَاشْرَبِيْ وَقَرِّيْ عَيْناً
“তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নিজের দিকে নাড়া দাও, তা তোমার ওপর তাজা ও সুস্বাদু খেজুর ফেলবে। তুমি তা আহার করো, পান করো এবং চোখ জুড়াও।” (সূরা মারয়াম: ২৫-২৬)
এমনকি অনাগত সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ইসলাম মাকে এই সময় রোজা রাখার বাধ্যবাধকতা থেকেও শিথিলতা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ اللهَ وَضَعَ عَنِ الْمُسَافِرِ شَطْرَ الصَّلَواةِ وَالصَّوْمَ عَنِ الْمُسَافِرِ وَعَنِ الْمُرْضِعِ وَالْحُبْلَى
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মুসাফিরের জন্য সালাত অর্ধেক করে দিয়েছেন এবং মুসাফির, স্তন্যদাত্রী মা ও গর্ভবতী মহিলার ওপর থেকে রোজা পালনের কঠিন বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়েছেন।” (সুনানে নাসাঈ)
৩. মানসিক ও চারিত্রিক বুনিয়াদ গঠন:
মায়ের চিন্তা-চেতনা এবং মানসিক অবস্থা গর্ভস্থ শিশুর স্বভাবে গভীর প্রভাব ফেলে। এই নাজুক সময়ে মাকে যাবতীয় ঝগড়া-বিবাদ, মানসিক চাপ এবং অশ্লীল চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং ভালো চিন্তা করা মায়ের ওপর সন্তানের একটি নিভৃত অধিকার; কারণ মায়ের মন যেমন হবে, সন্তানের স্বভাবও তেমন হবে। এছাড়া হারাম খাদ্য পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ হারাম রক্ত-মাংসে বেড়ে ওঠা সন্তান কখনও সুশীল হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
وَكُلُواْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللهُ حَلاَلاً طَيِّباً
“আল্লাহ তোমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো।” (সূরা মায়েদাহ: ৮৮)
সন্তানকে সুষ্ঠু ও সুন্দর মনের একজন আদর্শবান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার প্রধান দায়িত্ব মায়ের। মায়ের মন-মানসিকতার উপর নির্ভর করে সন্তানের মন-মানসিকতা। পৃথিবীর অধিকাংশ মা এ বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান না করার কারণে সন্তান হয় দুশ্চরিত্র। তাই একজন সুন্দর মনের সন্তান পেতে হ’লে মাকে সুন্দর পূত-পবিত্র মানসিকতাসম্পন্ন হ’তে হবে। গর্ভস্থ সন্তানের স্বার্থেই এটি প্রত্যেক মায়ের কর্তব্য এবং ভবিষ্যৎ সন্তানের এটি অধিকার। সন্তানের জন্য গর্ভবতী মাতার এসব মু‘আমালাত অবশ্যই পালনীয়। এতে মাতা ও সন্তানের পার্থিব কল্যাণ নিহিত রয়েছে এবং পরকালে মাতার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।
(খ) জন্ম-পরবর্তী অধিকার: মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব
একটি গাছের কচি ডগা যেমন তার মূলের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি সদ্যজাত শিশুটিও এই পৃথিবীতে আসার পর সম্পূর্ণভাবে তার মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার এক অসীম কুদরত হলো—শিশু পৃথিবীতে আসার সাথে সাথেই তার উপযোগী খাবার হিসেবে মায়ের স্তনে দুধের ধারা প্রবাহিত হয়। এই দুধ কেবল পানীয় নয়, বরং সন্তানের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এক বিশেষ অধিকার।
১. স্তন্যদান সম্পর্কে মহান আল্লাহর নির্দেশনা
বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া কোনো মায়েরই উচিত নয় তার সন্তানকে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করা। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মায়েদের প্রতি এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন:
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلاَدَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُُّتِمَّ الرَّضَاعَةَ
“আর মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যদি কেউ দুধ পান করানোর সময় পূর্ণ করতে চায়।” (সূরা বাক্বারাহ: ২:২৩৩)
২. মাতৃদুগ্ধ: এক স্বর্গীয় মহৌষধ
মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এমন এক তৈরি খাবার, যা শিশুর হজমক্ষমতার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এর কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রাকৃতিক তাপমাত্রা: শিশুর শরীরে যে তাপমাত্রার দুধ প্রয়োজন, ঠিক সেই তাপমাত্রাতেই মায়ের বুকের দুধ উৎপন্ন হয়।
পরিবর্তনশীল পুষ্টি: শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে তার শরীরের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন মায়ের দুধের পুষ্টি উপাদানেও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিবর্তন ঘটে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: মায়ের দুধে থাকা ল্যাকটোফেরিন, লাইসোজাইম এবং শ্বেত রক্তকণিকা শিশুর দেহে সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করে। এটি ডায়রিয়া, কান পাকা রোগ, এমনকি ভবিষ্যতে হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়।
মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ: বুকের দুধ পান করলে শিশুর চেহারা লাবণ্যময় হয়, তার বাকশক্তি ফুটে ওঠে এবং বুদ্ধি বিকশিত হয়।
৩. এক অপূরণীয় ক্ষতি ও আমাদের সচেতনতা
আজকাল অনেক নারী কেবল নিজেদের শারীরিক গঠন বা রূপ-লাবণ্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে সন্তানকে বুকের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকেন। এটি একটি অত্যন্ত হীন মানসিকতা। মনে রাখা প্রয়োজন, সন্তানকে স্তন্যদানের মাধ্যমে মায়ের হৃদয়ে সন্তানের প্রতি এক গভীর আবেগ ও স্নেহ তৈরি হয়। শিশুকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অর্থ হলো তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করা।
৪. বিকল্প ধাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা
যদি বিশেষ কোনো কারণে মা তার সন্তানকে দুধ পান করাতে না পারেন এবং অন্য কোনো মহিলার (দুধ মা) প্রয়োজন হয়, তবে সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ শিশুর স্বাস্থ্য, চরিত্র ও রুচি গঠনে দুধের প্রভাব অনেক। তাই অসুস্থ বা দুশ্চরিত্রা কোনো মহিলার দুধ পান করানো থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।
স্নেহের পরশে প্রতিপালন: কোমল হৃদয়ের দাবি
সন্তান মায়ের কলিজার টুকরো, তাই সে মায়ের কাছ থেকে পরম স্নেহ ও মমতাময় আচরণের দাবিদার। কোনো প্রকার বিরক্তি বা ঘৃণা নয়, বরং অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে সন্তানের পরিচর্যা করা মায়ের নৈতিক দায়িত্ব। যে শিশুরা শৈশবে মা-বাবার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের চরিত্রে এক ধরনের রুক্ষতা ও মানসিক জটিলতা তৈরি হয়।
স্নেহের পরশ দিয়ে সন্তান লালনকারী মা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন। একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হাসান বিন আলী (রা.)-কে অত্যন্ত স্নেহে চুম্বন করলেন। পাশেই বসা ছিলেন আকরা বিন হাবিস (রা.)। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কোনোদিন চুমু দিইনি।” রাসুলুল্লাহ (সা.) তার দিকে তাকিয়ে কঠোর এক সত্য উচ্চারণ করলেন:
إِنَّهُ مَنْ لاَ يَرْحَمْ لاَ يُرْحَمْ
“যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।” (সহিহ বুখারি)
অন্য একটি বর্ণনায় মা আয়েশা (রা.) বলেন, একদল গ্রাম্য লোক নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা কি আপনাদের সন্তানদের চুমু দেন?” উপস্থিত সবাই বললেন, “হ্যাঁ, দিই।” তখন তারা অবাক হয়ে বলল, “আল্লাহর কসম! আমরা তো কখনোই চুমু দিই না।” আল্লাহর রাসুল (সা.) তখন বললেন:
أَمْلِكُ أَنْ كَانَ اللهُ قَدْ نَزَعَ مِنْكُمُ الرَّحْمَةَ
“আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে মায়া-মমতা ছিনিয়ে নেন, তবে তাতে আমার কী করার আছে?” (সহিহ মুসলিম)
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, শিশু বয়সে মায়ের মমতা না পেলে যে একাকিত্ব ও অসহায়ত্ব তৈরি হয়, তার নেতিবাচক প্রভাব সন্তানকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। তাই মায়ের স্নেহ কেবল আবেগ নয়, এটি সন্তানের একটি মৌলিক অধিকার।
৩. পিতৃহারা সন্তানের প্রতিষ্ঠায় মায়ের আত্মত্যাগ
সন্তানকে সমাজে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পিতা ও মাতা উভয়ের। তবে কোনো কারণে যদি পিতা মারা যান, তবে সেই পাহাড়সম দায়িত্ব মায়ের কাঁধে এসে পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের রূপ-লাবণ্য বা ব্যক্তিগত সুখের মায়ায় অন্য ঘরে না গিয়ে, যারা অনাথ সন্তানদের মানুষ করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন, তারাই নারী জাতির গৌরব।
পিতৃহারা সন্তানের কল্যাণে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেওয়া এক অনন্য ত্যাগ। এমন জননীদের জন্যই পরকালে রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে প্রতিটি পদে ত্যাগের মধ্য দিয়েই একজন মা তার সন্তানের প্রতি চূড়ান্ত দায়িত্ব পালন করেন।
প্রাথমিক জ্ঞান দান: মায়ের কোলই প্রথম পাঠশালা
একটি শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করার আগে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টি কাটায় মায়ের আঁচলে। তাই মায়ের কোলই হলো শিশুর শিক্ষার প্রথম বিদ্যাপীঠ। শৈশবে শিশুর মন থাকে নরম মাটির মতো, মা তাকে যে ছাঁচে গড়বেন, সে সেভাবেই গড়ে উঠবে। মায়ের প্রতিটি কথা ও আচরণ শিশুর অবুঝ মনে গভীর রেখাপাত করে।
যখন শিশু আধো আধো বুলি শিখতে শুরু করে, তখন মায়ের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শব্দ চয়ন করা। সন্তানের সামনে কখনো কোনো কটু বা অশালীন বাক্য উচ্চারণ করা উচিত নয়। এর পরিবর্তে মা তার সন্তানকে ইসলামের সুমহান আদর্শ, সুন্দর আদব-কায়দা এবং সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন। শিশুর ছোট ছোট অভ্যাস যেমন—খাবারের আগে হাত ধোয়া, বড়দের সম্মান করা, অতিরিক্ত ভোজন না করা এবং শান্তভাবে কথা বলা—এগুলো মা তার মিষ্টি কথার মাধ্যমে শেখাবেন।
মিথ্যা বলা বা অহেতুক কথা বলার মতো অশালীন কাজ থেকে শিশুকে দূরে রাখা এবং মন্দ কাজের জন্য মৃদু শাসন ও ভালো কাজের জন্য উৎসাহ প্রদান করা মায়ের ওপর সন্তানের একটি মৌলিক অধিকার। মা যদি তার এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবেই সমাজ একটি সুদৃঢ় ও আদর্শ ভিত্তি লাভ করবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন যাপনে অভ্যস্ত করা
ইসলামি জীবনদর্শনে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা কেবল সৌন্দর্যের ভিত্তি নয়, বরং এটি ঈমানের অপরিহার্য অংশ। শরীর, পোশাক এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন না থাকলে যেমন সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে না, তেমনি আল্লাহর ইবাদতেও একাগ্রতা আসে না।
একজন মা তার সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার এই শিক্ষা হাতে-কলমে দেবেন। খাবারের পাত্র পরিষ্কার রাখা, নিজের শরীর ও পোশাক পরিপাটি রাখা এবং রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার কৌশলগুলো মা তার শিশুকে শেখাবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِيْنَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِيْنَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।” (সূরা বাক্বারাহ: ২২২)
পবিত্রতা কেবল নিজের শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ঘর-দোর এবং আশপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখা জরুরি। এ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা.)-এর নির্দেশনা হলো:
نَظِّفُوْا أَفْنِيَتَكُمْ
“তোমরা তোমাদের বাড়ির আঙিনা ও সম্মুখভাগ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখো।” (তিরমিযী)
কুমার যেমন নরম মাটিকে তার ইচ্ছেমতো রূপ দিতে পারে, মা-ও তেমনি শৈশবে শিশুকে পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার দীক্ষা দিয়ে তার ভবিষ্যৎ জীবনের রুচি ও চরিত্র গঠন করে দিতে পারেন।
ব্যবহারিক শিক্ষা দান: জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
দৈনন্দিন জীবনের এমন অনেক ছোটখাটো কাজ আছে, যা শৈশব থেকে অভ্যস্ত না হলে বড় হয়ে তা পালন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের ব্যবহৃত পোশাক পরিপাটি করে রাখা, শোয়ার ঘর গুছিয়ে রাখা এবং ওযু-গোসলের মাধ্যমে সর্বদা পাক-পবিত্র থাকার মতো বিষয়গুলো মা তার সন্তানকে হাতে-কলমে শেখাবেন।
বিশেষ করে কন্যা সন্তানদের গৃহস্থালি কাজে দক্ষ করে তোলা, রান্নাবান্না ও ঘরকন্যার প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া মায়ের একটি বড় দায়িত্ব। যাতে তারা ভবিষ্যতে একজন আদর্শ গৃহিণী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। একজন মা হলেন তার সন্তানের জন্য একটি জীবন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জীবনের চলার পথে ব্যবহারিক কাজগুলো শিক্ষা দিয়ে সন্তানকে আগামীর জন্য প্রস্তুত করে দেওয়াই হলো মায়ের ওপর সন্তানের অন্যতম অধিকার।
তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া
সন্তানকে প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন সৎ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে মাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করতে হয়। ইসলাম নারীকে ঘরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন:
وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ، وَهِىَ مَسْئُوْلَةٌ عَنْهُمْ
“স্ত্রীরা তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের রক্ষক বা অভিভাবক; আর সে তাদের (অধীনস্থদের) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
সন্তানের গতিবিধি, সঙ্গ এবং আচার-আচরণের ক্ষেত্রে মা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে না পারেন, তবে সেই শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যেতে পারে। একজন দক্ষ চালক সামান্য অমনোযোগী হলে যেমন বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তেমনি মা যদি সন্তানের তত্ত্বাবধানে সামান্যতম অবহেলা করেন, তবে সেই সন্তানের জীবনের সোনালি সম্ভাবনা কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাই স
ন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রত্যেক মাকে অত্যন্ত সচেতনভাবে তার এই অভিভাবকত্ব পালন করতে হবে।
চলবে……..
সন্তানের অধিকার নিয়ে সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. প্রশ্ন: ইসলামে সন্তানের প্রথম অধিকার কোনটি?
উত্তর: ইসলাম অনুযায়ী সন্তানের প্রথম অধিকার হলো সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই শুরু হয়। অর্থাৎ, একজন নেককার ও আদর্শ মা বা বাবা নির্বাচন করা এবং জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা।
২. প্রশ্ন: সন্তানকে কত বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করানো উচিত?
উত্তর: পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্বারাহর ২৩৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, সন্তানকে পূর্ণ ২ বছর (২৪ মাস) পর্যন্ত স্তন্যদান করার কথা বলা হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজনে বা চিকিৎসকের পরামর্শে এর কম-বেশি হতে পারে।
৩. প্রশ্ন: অনাগত (গর্ভস্থ) সন্তানের ওপর কি কোনো হক বা অধিকার আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, গর্ভস্থ সন্তানের প্রধান অধিকার হলো তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মায়ের হালাল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা। এছাড়া মায়ের মানসিক প্রশান্তি ও ইবাদতপূর্ণ পরিবেশও গর্ভস্থ শিশুর একটি বিশেষ অধিকার।
৪. প্রশ্ন: পিতৃহারা বা এতিম সন্তানের প্রতি মায়ের দায়িত্ব কী?
উত্তর: পিতা মারা গেলে মা-ই সন্তানের প্রধান অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক। এতিম সন্তানের সম্পদ রক্ষা করা এবং তাকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা মায়ের অন্যতম গুরুদায়িত্ব।
৫. প্রশ্ন: কন্যাসন্তান ও পুত্রসন্তানের অধিকারে কি কোনো পার্থক্য আছে?
উত্তর: না, লালন-পালন, স্নেহ-মমতা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলাম কন্যাসন্তান ও পুত্রসন্তানের মাঝে কোনো বৈষম্য সমর্থন করে না। বরং কন্যাসন্তানকে উত্তমরূপে লালন-পালনকারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।











