সম্পদের লোভ: অতৃপ্ত আত্মার এক অন্তহীন মরীচিকা

মানুষের আদিম প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে ‘সম্পদে লোভ’ অন্যতম, বিশেষ করে বস্তুগত সম্পদের প্রতি এই মোহ যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তা হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক। সম্পদ জীবনের আবশ্যিক উপকরণ হলেও, এর প্রতি অন্ধ আসক্তি মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে। চিরকাল ধরে বিত্ত-বৈভবের এই মোহ মানুষকে সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত শান্তিকে করে তুলেছে সুদূরপরাহত। যে সম্পদের লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল কল্যাণ, লোভের বশবর্তী হয়ে সেই সম্পদই আজ মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয় এবং আত্মিক শূন্যতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা সম্পদের প্রতি এই সংহারী লোভের প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করব।

সূচিপত্র

পবিত্র আল-কুরআনের আলোকে সম্পদের মোহ

সম্পদের প্রতি মানুষের এই যে লাগামহীন প্রতিযোগিতা, এর পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ . حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ

অনুবাদ: “প্রাচুর্যের লালসা তোমাদেরকে গাফেল (মোহাচ্ছন্ন) করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছাও।” (সূরা আত-তাকাসুর: ১-২)

এই আয়াতের গভীরতা নির্দেশ করে যে, মানুষের সম্পদের তৃষ্ণা কখনোই মিটবার নয়। জাগতিক এই মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে যায় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই চক্র থেকে বের হতে পারে না।

আরো পড়ুন

ইসলামে শিশু শাসনের নিয়ম: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক পদ্ধতি

আকাশপথে ধ্বংসের পদধ্বনি: হাদীসের ভাষ্য ও বর্তমান আরব বিশ্বের অস্থিরতা

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সতর্কবাণী: অভাব কি দারিদ্র্যে নাকি লালসায়?

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতকে সম্পদের মোহের ধ্বংসাত্মক দিক সম্পর্কে বারবার সাবধান করেছেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, দারিদ্র্য ভয়ের কিছু নয়, বরং সম্পদের প্রাচুর্যই অনেক সময় বিপদের কারণ হয়। হাদিস শরিফে এসেছে:

فَوَاللَّهِ لَا الْفَقْرَ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ عَلَيْكُمْ الدُّنْيَا كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا، وَتُهْلِكُكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ

অনুবাদ: “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় করি না; বরং আমি ভয় করি যে, তোমাদের সামনে দুনিয়া (সম্পদ) উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর তোমরা তা অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে যেমন তারা করেছিল এবং তা তোমাদের ধ্বংস করে দেবে যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।” (সহিহ বুখারি)

হিসাব দিতে হবে প্রতিটি কণার

কিয়ামতের কঠিন ময়দানে প্রতিটি মানুষকে তার অর্জিত সম্পদের উৎস এবং ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:

لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: …وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَا أَنْفَقَهُ

অনুবাদ: “কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের পা দুটি নড়বে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে: …তার সম্পদ সম্পর্কে, সে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোথায় ব্যয় করেছে।” (তিরমিজি)

 

অতৃপ্তির অন্তিম সীমা: কবরের মাটি যখন শেষ ভরসা

মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদার কোনো শেষ নেই। জাগতিক সম্পদে মানুষের মন কখনোই ভরে না। এই চিরন্তন সত্যটি রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উদাহরণের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন:

لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيًا مِنْ ذَهَبٍ لَأَحَبَّ أَنْ يَكُونَ لَهُ ثَانِيًا، وَلَا يَمْلأُ فَاهُ إِلَّا التُّرَابُ

অনুবাদ: “যদি আদম সন্তানকে স্বর্ণে ভরা একটি উপত্যকা দিয়ে দেওয়া হয়, তবে সে দ্বিতীয় আর একটি উপত্যকা পাওয়ার লালসা করবে। আর মানুষের মুখ কবরের মাটি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পূর্ণ করা সম্ভব নয়।” (সহিহ তিরমিজি)

অর্থাৎ, সম্পদের পেছনে মানুষের এই যে ‘হা-হুতাশ’ এবং ‘আরও চাই’ প্রবণতা—এর সমাপ্তি ঘটে কেবল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। বয়সের সাথে সাথে মানুষের দেহ জীর্ণ হলেও দুটি জিনিস ক্রমশ তরুণ বা শক্তিশালী হতে থাকে:১. সম্পদের লোভ এবং ২. দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার আশা।

সম্পদ বনাম সম্পদাসক্তি: জীবন-তরণীর এক চমৎকার উদাহরণ

মাওলানা রুমি (রহ.) সম্পদ এবং মানুষের সম্পর্কের এক অসাধারণ দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা আমাদের জীবনকে নতুন করে ভাবাবে। তিনি বলেছেন:

آب اندر زیرِ کشتی است * آب در کشتی هلاکِ کشتی است

অনুবাদ: “নৌকা চলার জন্য পানির প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই পানি যতক্ষণ নৌকার নিচে থাকে, ততক্ষণ তা নৌকার উপকারে আসে। আর সেই পানি যদি নৌকার ভেতরে ঢুকে যায়, তবে তা নৌকাকে ডুবিয়ে দেয়।”

জীবনদর্শন: আমাদের জীবন হলো একটি নৌকার মতো, আর সম্পদ হলো সেই পানির মতো যার ওপর দিয়ে জীবন-তরণী এগিয়ে চলে। বেঁচে থাকার জন্য সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। পবিত্র কুরআনেও বলা হয়েছে:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَ ابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ

অনুবাদ: “অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক) তালাশ করো।” (সূরা জুমুআ: ১০)

কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন সেই সম্পদ বা দুনিয়াদারী মানুষের অন্তরের ভেতরে (নৌকার ভেতরে) প্রবেশ করে। সম্পদ যখন প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে ‘লোভে’ পরিণত হয়, তখন তা মানুষের নৈতিকতা ও আত্মাকে ধ্বংস করে দেয়।

সম্পদ কি পাপের পথে সহায়ক?

দারিদ্র্যের চেয়ে সম্পদের আধিক্য অনেক সময় অধিক ভয়ানক হয়ে দাঁড়ায়। অভাব মানুষকে হয়তো কষ্টে রাখে, কিন্তু প্রাচুর্য মানুষকে পাপাচারের দিকে ধাবিত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। সম্পদ বেশি থাকলে মানুষ অহংকারী হয়ে ওঠে এবং গুনাহের সরঞ্জাম সংগ্রহ করা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। এজন্যই সম্পদের মোহে মত্ত হওয়ার চেয়ে অল্পে তুষ্ট থাকাই হলো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

 

হালাল উপার্জন: একটি বাধ্যতামূলক ইবাদত

ইসলাম সম্পদকে কেবল ঘৃণা করতে শেখায় না, বরং বৈধ উপায়ে উপার্জন করতে উৎসাহিত করে। সম্পদের মোহ যেমন নিন্দনীয়, তেমনি অলস বসে থেকে অভাবকে বরণ করে নেওয়াও কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর একটি মহান বাণী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

كَسْبُ الْحَلَالِ فَرِيضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ

অনুবাদ: “ফরজ ইবাদতের পর হালাল উপায়ে জীবিকা অন্বেষণ করাও একটি ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য।” (বায়হাকি)

সুতরাং, পরিবারের ভরণপোষণ এবং নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য সম্পদ অর্জন করা কোনো পাপ নয়, বরং এটি একটি সওয়াবের কাজ—যদি তার পদ্ধতি হয় সৎ ও বৈধ।

অভাবের ঝুঁকি বনাম লোভের সীমা

চরম দারিদ্র্য অনেক সময় মানুষের ঈমানকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। অভাব যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষের মনে কুচিন্তা বা অনৈতিক পথে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা জাগতে পারে। রাসূল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন:

كَادَ الْفَقْرُ أَنْ يَكُونَ كُفْرًا

অনুবাদ: “অভাব-অনটন অনেক সময় মানুষকে কুফর বা অবিশ্বাসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।” (বায়হাকি)

তবে মনে রাখতে হবে, অভাবের কারণে মানুষ যতটা না পথভ্রষ্ট হয়, তার চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট হয় সম্পদের ‘অশুভ লোভের’ কারণে। তাই সম্পদ ততক্ষণই কল্যাণকর, যতক্ষণ তা শরীয়তসম্মত উপায়ে আসে এবং তার হক (যাকাত, সদকা) আদায় করা হয়।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সঠিক নিয়ত

অনেকে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সম্পদ সঞ্চয় করেন। যদি নিয়ত সহিহ থাকে যে—সন্তানরা যেন কারো কাছে হাত না পাতে—তবে সেই সঞ্চয়ও সওয়াবের অন্তর্ভুক্ত। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে:

إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ

অনুবাদ: “তুমি তোমার উত্তরাধিকারীদের অভাবমুক্ত অবস্থায় রেখে যাওয়া, তাদের মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি)

সারকথা: সম্পদ যখন মানুষের উপকারের জন্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় হয়, তখন তা আর ‘লোভ’ থাকে না; তা হয়ে ওঠে ‘বরকত’। সবকিছুর মূলেই রয়েছে নিয়ত। যদি উপার্জনের উদ্দেশ্য হয় পরোপকার এবং বৈধ জীবনযাপন, তবে সেই সম্পদই হবে পরকালের পাথেয়।

 

পাপের বোঝা: অন্যের জন্য নিজের পরকাল বিসর্জন নয়

আমরা অনেক সময় সন্তানদের সুখের কথা চিন্তা করে বা আভিজাত্য প্রদর্শনের নেশায় অবৈধ উপার্জনের পথে পা বাড়াই। কিন্তু ইসলামের অমোঘ নীতি হলো—একজনের পাপের বোঝা অন্যজন বহন করবে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ

অনুবাদ: “কেউ অন্য কারো (পাপের) বোঝা বহন করবে না।” (সূরা ফাতির: ১৮)

আপনি হয়তো সুদের ওপর ঋণ নিয়ে বিশাল অট্টালিকা গড়লেন বা দুর্নীতির মাধ্যমে পাহাড়সম সম্পদ রেখে গেলেন; কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পদ ভোগ করবে আপনার উত্তরসূরিরা, আর তার কঠিন হিসাব ও আজাব ভোগ করতে হবে আপনাকে একা। সন্তানদের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া জরুরি, কিন্তু সেই সম্পদ যেন আপনার জাহান্নামের কারণ না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা ঈমানের দাবি।

পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়ার উপায় নেই

পরকালের বিচার দিবসে মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত এবং প্রতিটি কণার হিসাব নেওয়া হবে। সম্পদ অর্জনের নেশায় যারা বুঁদ হয়ে থাকে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটি এক চরম সতর্কবার্তা:

لَا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ: عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلَاهُ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَا أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ

অনুবাদ: “কিয়ামতের দিন কোনো আদম সন্তান পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও নড়তে পারবে না: ১. তার জীবন সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে? ২. তার যৌবনকে সে কোথায় ক্ষয় করেছে? ৩. সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে? ৪. সেই সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? ৫. যে জ্ঞান সে অর্জন করেছিল, সে অনুযায়ী কতটা আমল করেছে?” (তিরমিজি)

এটি স্পষ্ট যে, নামাজ-রোজার হিসাবের পাশাপাশি আমাদের আয়ের উৎস এবং ব্যয়ের খাত সম্পর্কেও পুঙ্খানুপুঙ্খ জবাব দিতে হবে। সুদি কারবার বা অনৈতিক পথে অঢেল সম্পদ করার চেয়ে একটি টিনের ঘরে সাদাসিধে হালাল জীবনযাপন করা অনেক বেশি নিরাপদ ও শান্তিময়।

দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে আমরা যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই, তা ক্ষণস্থায়ী। মুমিনের আসল প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত পুণ্য বা নেক কাজের ক্ষেত্রে। আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন:

فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ

অনুবাদ: “তোমরা সৎকাজে একে অপরের অগ্রগামী হও (প্রতিযোগিতা করো)।” (সূরা বাকারা: ১৪৮)

সাফল্য মানে ব্যাংক ব্যালেন্সের পাহাড় নয়; বরং সাফল্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে জান্নাতের পথে এগিয়ে যাওয়া।

 

 

লোভ দমনের কৌশল: দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই কি মুক্তির পথ?

মানুষের জন্মগতভাবেই ভালো জিনিসের প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকে—তা সে পরিবার হোক বা সম্পদ। এই আকাঙ্ক্ষা ততক্ষণ নিন্দনীয় নয়, যতক্ষণ তা নিয়ন্ত্রিত থাকে। তবে প্রশ্ন হলো, যখন এই চাহিদা সীমার বাইরে চলে যায়, তখন আমরা কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করব? শরীয়ত আমাদের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ফর্মুলা দিয়েছে।

১. দুনিয়াবী বিষয়ে নিচের দিকে তাকান

লোভ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো নিজের চেয়ে বেশি সম্পদশালীদের দিকে তাকিয়ে হাহুতাশ করা। অন্যের অট্টালিকা বা গাড়ি দেখে আমরা নিজের সামান্য সম্বলকেও তুচ্ছ মনে করতে শুরু করি। এই ব্যাধি থেকে বাঁচতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন:

انْظُرُوا إِلَى مَنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ، وَلَا تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ

অনুবাদ: “তোমরা দুনিয়াবী বিষয়ে নিজেদের চেয়ে নিম্নাবস্থায় যারা আছে তাদের দিকে তাকাও; তাদের দিকে তাকিও না যারা তোমাদের চেয়ে উপরে আছে।” (সহিহ মুসলিম)

আপনার হয়তো একটি সাধারণ ঘর আছে, কিন্তু ভেবে দেখুন—অনেকের মাথার ওপর ছাদটুকুও নেই। আপনার সুন্দর পোশাক আছে, কিন্তু অনেকের হয়তো শরীর ঢাকার মতো কাপড়ও নেই। যখন আপনি নিজের চেয়ে অভাবী মানুষের দিকে তাকাবেন, তখন আপনার হৃদয়ে অভিযোগের বদলে ‘শোকর’ বা কৃতজ্ঞতাবোধ জাগ্রত হবে।

২. দ্বীনদারীর বিষয়ে উপরের দিকে তাকান

দুনিয়ার ঠিক বিপরীত নিয়ম হলো ইবাদত বা দ্বীনদারীর ক্ষেত্র। এখানে আমাদের তাকাতে হবে যারা আমাদের চেয়ে বেশি পরহেজগার, বেশি আমলকারী বা বেশি দানশীল তাদের দিকে। তাদের দেখে আমাদের মনে ঈর্ষণীয় প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়া উচিত যে—”সে যদি এত নেক কাজ করতে পারে, তবে আমি কেন পিছিয়ে থাকব?” এই ইতিবাচক প্রতিযোগিতা মানুষের আত্মিক উন্নতি ঘটায়।

লোভ বৃদ্ধির নেপথ্যে অপব্যয় ও সঙ্গদোষ

লোভ কেবল শূন্য থেকে তৈরি হয় না, এর পেছনে কিছু বাহ্যিক প্রভাব কাজ করে:

অপব্যয়: মানুষ যখন বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয় এবং অপব্যয় শুরু করে, তখন তার চাহিদাও জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। এই কৃত্রিম অভাব মেটাতেই মানুষ লোভে পড়ে।

সঙ্গদোষ: সবসময় অতি ধনীদের সাথে মেলামালা করলে মনের অজান্তেই তাদের জীবনযাত্রার মান (Standard) ধরার এক অসুস্থ স্পৃহা জাগে, যা মানুষকে অশান্ত করে তোলে।

 

দুনিয়ার অসারতা: মশার ডানার চেয়েও তুচ্ছ

আমরা যখন বিধর্মী বা অমুসলিমদের বৈষয়িক উন্নতি, বিশাল অট্টালিকা আর বিলাসিতা দেখি, তখন আমাদের মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) এক অমোঘ সত্য প্রকাশ করেছেন। একবার হযরত ওমর (রা.) আল্লাহর রাসূলকে (সা.) একটি সাধারণ খেজুর পাতার চাটাইয়ে শোয়া অবস্থায় দেখলেন, যার ফলে তাঁর পবিত্র পিঠে দাগ পড়ে গিয়েছিল। কায়সার ও কিসরার বিলাসিতার কথা ভেবে হযরত ওমর (রা.) কেঁদে ফেললে রাসূল (সা.) বলেছিলেন:

أُولَٰئِكَ قَوْمٌ عُجِّلَتْ لَهُمْ طَيِّبَاتُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا

অনুবাদ: “ওরা তো এমন এক সম্প্রদায়, যাদের যা কিছু পাওয়ার তা এই দুনিয়ার জীবনেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ আখিরাতে তাদের জন্য কিছুই নেই)।” (সহিহ বুখারি)

দুনিয়ার এই চাকচিক্য আল্লাহর কাছে কতটা মূল্যহীন তা বোঝা যায় নিচের হাদিসটি থেকে:

لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ، مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ

অনুবাদ: “দুনিয়া যদি আল্লাহর কাছে একটি মশার ডানার সমানও দামি হতো, তবে তিনি কোনো কাফেরকে এখান থেকে এক ঢোক পানিও পান করাতেন না।” (তিরমিজি)

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, পরকালের অনন্তকালের সুখের তুলনায় এই পৃথিবীর ভোগ-বিলাস অত্যন্ত নগণ্য। ইরশাদ হয়েছে:

فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ

অনুবাদ: “পরকালের তুলনায় দুনিয়ার এই জীবনের ভোগসামগ্রী অতি সামান্য।” (সূরা তওবা: ৩৮)

 

লোভ থেকে মুক্তির পথ: অল্পে তুষ্টি ও রাসূল (সা.)-এর আদর্শ

সম্পদের মরীচিকা থেকে বাঁচার জন্য কেবল এর কুফল জানাই যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। সম্পদের এই অসম প্রতিযোগিতায় হার না মানতে চাইলে আমাদের নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি:

১. উচ্চাভিলাষী সঙ্গ ত্যাগ ও অপব্যয় বর্জন

লোভ দানা বাঁধে যখন আমরা অতিরিক্ত বিলাসিতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। অপব্যয় মানুষের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়, আর সেই চাহিদা মেটাতে মানুষ অবলীলায় লোভে পা বাড়ায়। এছাড়া, সর্বদা অতি সম্পদশালীদের সঙ্গ দেওয়া এবং তাদের জীবনযাত্রার সাথে নিজের তুলনা করা হৃদয়ে অশান্তি তৈরি করে। তাই দ্বীনদার ও অল্পে তুষ্ট মানুষের সাহচর্য আমাদের অন্তরের প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

২. অভাবের জিন্দেগিতেই কি প্রকৃত কল্যাণ?

আমরা সাধারণত অভাবকে ভয় পাই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের ভিন্ন এক আদর্শ দেখিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন:

اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مِسْكِينًا وَأَمِتْنِي مِسْكِينًا وَاحْشُرْنِي فِي زُمْرَةِ الْمَسَاكِينِ

অনুবাদ: “হে আল্লাহ! আমাকে মিসকিন (অভাবী) অবস্থায় জীবিত রাখুন, মিসকিন অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং কিয়ামতের দিন মিসকিনদের দলেই আমার হাশর করুন।” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)

এটি এই জন্য নয় যে ইসলাম দারিদ্র্যকে উৎসাহিত করে, বরং এর মাধ্যমে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—অঢেল সম্পদের হিসাব দেওয়ার চেয়ে অল্পে তুষ্ট থেকে আল্লাহর শোকর আদায় করা অনেক বেশি সহজ ও নিরাপদ। একবার তাঁর কাছে ওহুদ পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তর করে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বলেছিলেন, “আমি চাই একদিন পেট ভরে খেয়ে আপনার শোকর আদায় করব, আর অন্যদিন ক্ষুধার্ত থেকে সবর করব।”

চূড়ান্ত উপসংহার: হৃদয়ের স্বচ্ছতাই প্রকৃত সম্পদ

আর্টিকেলের শেষ কথা হলো, সম্পদ অর্জন করা কোনো অপরাধ নয়, তবে সম্পদকে অন্তরে স্থান দেওয়া এবং তার লোভে অন্ধ হয়ে যাওয়া ধ্বংসের নামান্তর। মাওলানা রুমি (রহ.)-এর সেই নৌকার উদাহরণটি সর্বদা মনে রাখা উচিত—পানি নৌকার নিচে থাকলে তা চলার জন্য সহায়ক, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে তা ডুবিয়ে দেয়।

পৃথিবীর এই চাকচিক্য এক দিন শেষ হয়ে যাবে। সেদিন আমাদের সাথে আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স বা অট্টালিকা যাবে না, যাবে কেবল একটি ‘কালবে সেলিম’ বা পবিত্র ও লোভমুক্ত হৃদয়। সুতরাং আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিকে দুনিয়ার মোহ থেকে সরিয়ে

আখিরাতের চিরস্থায়ী সাফল্যের দিকে নিবদ্ধ করি। আল্লাহ আমাদের সম্পদের এই ভয়াবহ মোহ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here